চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় ধারাবাহিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনার প্রেক্ষিতে আদালতের দেওয়া নির্দেশনা প্রতিপালন না করায় চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজারকে আদালতে তলব করা হয়েছে। গত সোমবার দুপুরে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মো. নসরুল্লাহর আদালত থেকে এই আদেশ প্রদান করা হয়। মূলত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা জনমনে চরম আতঙ্ক ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করলে বিষয়টি আদালতের নজরে আসে এবং বিচারক স্বপ্রণোদিত হয়ে এই আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আদালতের নির্দেশ ছিল চুরির ঘটনার সাথে জড়িতদের শনাক্তকরণ, খোয়া যাওয়া মালামাল উদ্ধার এবং এই বিষয়ে গৃহীত আইনগত পদক্ষেপের বিস্তারিত প্রতিবেদন তিন কার্যদিবসের মধ্যে দাখিল করার, যা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই অবহেলা ও আদালতের আদেশ অমান্য করার দায়ে আগামী ৩০ আগস্ট জেনারেল ম্যানেজারকে ব্যক্তিগতভাবে আদালতে হাজির হয়ে সশরীরে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী গ্রাহক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দায়িত্বহীনতা ও গাফিলতির কারণেই চোরচক্র দিনের পর দিন ট্রান্সফরমার চুরির সাহস পাচ্ছে। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, প্রতিটি চুরির ঘটনার পর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তাদের দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকতে হয়, যা স্বাভাবিক জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রাহক অভিযোগ করে বলেন, বারবার অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি দৃশ্যমান কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, বরং চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমার বসানোর নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হতে হয়। ট্রান্সফরমার চুরির এই চক্রটি অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং প্রশাসনিক নজরদারির অভাব থাকায় তারা বারবার একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত করার সুযোগ পাচ্ছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন। ভুক্তভোগীরা মনে করছেন, যদি শুরু থেকেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করত, তবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের এমন অপচয় ও জনদুর্ভোগ রোধ করা সম্ভব হতো।
আদালতের এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এমন নীরবতা ও আদালতের নির্দেশকে গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবকে প্রকট করে তুলেছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের নির্দেশ অমান্য করা কেবল একটি দাপ্তরিক ভুল নয়, বরং এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি অবজ্ঞা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আগামী ৩০ আগস্টের শুনানিতে জেনারেল ম্যানেজারকে শুধুমাত্র প্রতিবেদন দাখিল করলেই হবে না, বরং কেন তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতের নির্দেশ পালন করেননি, সে বিষয়েও লিখিত ও মৌখিক ব্যাখ্যা দিতে হবে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই ঘটনার মাধ্যমে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও নিরাপত্তা দুর্বলতা চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো চুরির হাত থেকে রক্ষা পায়।
ট্রান্সফরমার চুরির এই ধারাবাহিকতা কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে না, বরং এটি সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করছে এবং জননিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। আদালতের এই তলবাদেশ কেবল একটি নির্দিষ্ট চুরির ঘটনার তদন্তে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিদ্যুৎ বিভাগের উদাসীনতার বিরুদ্ধে একটি বার্তা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। যদি এই ঘটনার মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা না যায়, তবে ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধপ্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, বিচার বিভাগীয় এই হস্তক্ষেপের ফলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তাদের সেবার মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য হবে এবং সরকারি সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিতে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।