চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক শহরের সরকারি সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে একগুচ্ছ কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছেন। গত ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত এই সভায় তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, মেঘনা নদীকে ঢাকার বুড়িগঙ্গার ন্যায় দূষিত হতে দেওয়া হবে না। এমপি মানিকের ভাষ্যমতে, শহরের এসবি খাল ও পুরানবাজারের নাপিতবাড়ি খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলাধারগুলো বর্তমানে প্রভাবশালী দখলদারদের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। তিনি রাইসমিল মালিকদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বলেন, যারা খাল ভরাট ও দূষণ করেছে, তাদের মাধ্যমেই খালগুলো পুনরায় খনন ও পরিষ্কার করাতে হবে। এছাড়া শহরের নতুন ভবনের ক্ষেত্রে সোকওয়েল ছাড়া নকশা অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মূলত নদী ও খাল রক্ষা এবং সরকারি জমি উদ্ধারকে তিনি বর্তমান প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশেষ করে রেলওয়ের জায়গাগুলো বর্তমানে মাদক কারবারিদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার কারণে ট্রেনে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটছে, যা সাধারণ মানুষের যাতায়াতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। অন্যদিকে পাসপোর্ট অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমপি মানিক সরাসরি পাসপোর্ট অফিসের সামনের দোকানগুলোকে দালালদের মূল কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করে এগুলো উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া রাজরাজেশ্বর, ইব্রাহিমপুর, নীলকমল ও লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে বাল্যবিবাহের উচ্চ হারের বিষয়টি উল্লেখ করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতার অভাবকে দায়ী করেছেন তিনি। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা বা গাফিলতির কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়ে আশ্বস্ত করা হলেও, মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগ কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে। এমপি মানিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় কোনো প্রকার বাধা বা অসহযোগিতা বরদাস্ত না করার ঘোষণা দিয়েছেন এবং রাজরাজেশ্বর ও নীলকমলে দ্রুত পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে অতীতেও সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক শৈথিল্যের কারণে তা বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। এমপির এই কঠোর বার্তার পর এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো কতটা দ্রুততার সাথে দখলদারদের উচ্ছেদ ও পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
চাঁদপুরের সামগ্রিক উন্নয়ন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই কঠোর অবস্থান একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নদী দূষণ রোধ এবং সরকারি সম্পদ উদ্ধারের এই প্রক্রিয়া সফল হলে তা শহরের নাগরিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনবে। তবে কেবল সভার নির্দেশনায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি নির্দেশনা যদি বাস্তবায়নের আওতায় না আনা হয়, তবে চাঁদপুরের নাগরিক সমস্যাগুলো স্থায়ী রূপ ধারণ করবে। সরকারি সেবার মান উন্নয়ন, দালালমুক্ত পাসপোর্ট অফিস এবং মাদকমুক্ত রেলওয়ে এলাকা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘব করা সম্ভব, অন্যথায় এই কঠোর বার্তা নিছক কথার ফুলঝুড়ি হিসেবেই বিবেচিত হবে।