“ভাইরে ভাই, ভুল হয়া গেছে, আমায় ক্ষমা কইরা দেন " | আই নিউজ বিডি

“ভাইরে ভাই, ভুল হয়া গেছে, আমায় ক্ষমা কইরা দেন "

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
“ভাইরে ভাই, ভুল হয়া গেছে, আমায় ক্ষমা কইরা  দেন "
“ভাইরে ভাই, ভুল হয়া গেছে, আমায় ক্ষমা কইরা  দেন "
ছবি: সংগৃহীত
আমায় ক্ষমা কইরা দেন ভাই, আমায় ক্ষমা কইরা দেন।

স্যরি।

 

  • সালাউদ্দিন আকবর , রম্য লেখক 

 

ভাইরে ভাই, ভুল হয়া গেছে! আমারে ক্ষমা কইরা দেন। এই দুনিয়ায় চোখ-কান খোলা রাখা যে কত বড় অপরাধ, সেইটা বুঝতে একটু দেরি হইয়া গেছে। তাই এখন থেইকা আমি একদম অন্ধ, কালা আর বোবা।

কিশোর গ্যাংয়ের ভাইয়েরা যখন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে চুলে হাত বুলাতে বুলাতে পুরো এলাকার ‘আইন-শৃঙ্খলার’ দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নেয়, তখন জনগণ দিশেহারা হয়ে কোন গলিতে লুকাবে তা ভেবে পায় না। কিন্তু আমি? আমি ভাই চুপ! তারা তো আসলে সমাজসেবা করতেছে, বিনোদন দিচ্ছে! আমি যদি এইটা নিয়া টু শব্দও করি, তবে আমার পিঠের চামড়া যে আর আস্ত থাকবে না, তা খুব ভালো করেই জানি। তাই হাত জোড় করে বলতেছি—আমায় ক্ষমা কইরা দেন, আমি কিচ্ছু দেখিনি, কিচ্ছু শুনিনি!

গ্যাস নাই, বিদ্যুৎ নাই—তাতে কী? আমরা তো মাছে-ভাতে বাঙালি! ভাতের হাঁড়িতে চাল ফুটাতে যদি সিলিন্ডার না পাই, তবে ওই যে আদিম যুগের মতো লাকড়ি দিয়ে রান্না করমু। দরকার পড়লে কাঁচা মাছ-ভাত খামু, তাও ভালো। কাঙ্গালি হয়ে থাকমু, কিন্তু তিতাস বা ডেসকোর অফিসে গিয়া একটা কথাও কমুনা। ভাইরে ভাই, ওনাদের সিস্টেমের ওপর কথা বলার মতো কলিজা আমার নাই। আমায় ক্ষমা কইরা দেন, আমি মোমবাতি জ্বালায়াই জীবন পার কইরা দিমু।

লাইনের গ্যাস তো নাই-ই, আর সিলিন্ডার গ্যাসের উর্ধগতি দেখে কলিজা শুকায়া যায়! মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ১২ কেজির সরকারি সিলিন্ডারের দাম ৪৭৫ টাকা বাড়ছে! এখন এক সিলিন্ডার কিনতে ২০৬০ টাকা লাগে, আর বাজারে গেলে তো দোকানদারা আড়াই হাজার টাকা হাঁকায়! ওনাদের এই রকেট গতির দাম বাড়া দেইখা আমি ভাবি—বাহ! ওনারা তো আসলে আমাদের কাঁচা সবজি আর সালাদ খাওয়ার অভ্যাস করাচ্ছেন, যাতে আমাদের গ্যাস্ট্রিক না হয়! সিলিন্ডারের দাম যদি পাঁচ হাজার টাকাও হয়, আমি হাসিমুখে পকেট খালি করে চলে আসমু, তাও ওনাদের সিন্ডিকেট নিয়া টু শব্দ করমু না। আমায় ক্ষমা কইরা দেন।

আর সমাজ ও দর্শনের যে উচ্চমার্গীয় কথা বলবো, তারও তো উপায় নাই। যেখানে নীতি আর দর্শনের কথা হওয়ার কথা, সেখানে পত্রিকার পাতা খুললেই দেখি আদিম হিংস্রতা আর ধর্ষণের খবর। সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে, এই প্রশ্ন করতে গেলেই আবার ‘অশান্তি সৃষ্টির’ দায়ে পইড়া যামু। তাই আমি ভাই চাদর মুড়ি দিয়া ঘুমায় থাকমু, কিচ্ছু কমুনা। আমায় ক্ষমা কইরা দেন।

এর সাথে আরও কিছু জিনিস যোগ না করলেই নয়। যেমন ধরেন—আমাদের রাস্তার জ্যাম! আড়াই ঘণ্টার রাস্তা যখন সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায় পার হই, তখন ভাবি—বাহ! সরকার তো আমাদের ধৈর্য পরীক্ষা নেওয়ার জন্য ফ্রিতে একটা ‘মেডিটেশন কোর্স’ করাচ্ছে! এই জ্যামের কল্যাণে গাড়িতে বসেই মানুষের পুরো উপন্যাস পড়া শেষ হয়ে যায়। এই মহান উদ্যোগের কোনো সমালোচনা আমি করমু না ভাই, আমায় ক্ষমা কইরা দেন।

আবার যখন বাজারে যাই, ১ কেজি আলুর দাম শুইনা যখন হার্ট অ্যাটাক হওয়ার অবস্থা হয়, তখন দোকানদারকে বলি—"ভাই, আলু লাগবে না, আলুর দিকে একটু তাকায়া থাকি, তাতেই পেট ভইরা যাবে।" সিন্ডিকেট ভাইদের রুটি-রুজিতে লাথি মারার মতো সাহস আমার নাই। তারা দাম ডাবল করুক আর ট্রিপল করুক, আমি হাসিমুখে পকেট খালি করে চলে আসমু। কিচ্ছু কমুনা যে, আমায় ক্ষমা কইরা দেন।

বৃষ্টির দিনে যখন ঢাকার রাস্তাঘাট সুইমিং পুল হয়া যায়, তখন তো মনটা খুশিতে নেচে ওঠে! বিদেশে মানুষ টাকা খরচ করে ওয়াটার পার্কে যায়, আর আমরা ফ্রিতেই ঘরের দুয়ারে বুড়িগঙ্গার ফিল পাই। ড্রেনের পানির সাথে সাঁতার কাটার এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কোনো নিন্দা আমি করতে পারমু না।

এর সাথে আরও কিছু জিনিস যোগ না করলেই নয়। যেমন ধরেন—আমাদের ঘরের ভেতরের চিরশত্রু ডেঙ্গু মশা! শীত আসুক আর বর্ষা যাক, এডিস মশার রাজত্বে কোনো ভাটা নাই। হাসপাতালগুলোতে সিট নাই, প্লাটিলেট নাই, চারদিকে শুধু হাহাকার। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের ভাইয়েরা যখন ফগার মেশিন দিয়া সুগন্ধি ধোঁয়া ছড়ায়, তখন আমার মনে হয় তারা তো আসলে আমাদের ফ্রিতে ‘ডিসকো ড্যান্সের’ পরিবেশ বানায় দিতাছে! মশার কামড়ে হাত-পা চুলকাইতে চুলকাইতে মরে যামু, তাও ওনাদের মশা নিধনের বাজেট নিয়া কোনো প্রশ্ন তুলমু না। মশা আমায় কামড়াক আর ডেঙ্গু হোক, আমি ওনাদের ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ কমু। কিচ্ছু কমুনা যে, আমায় ক্ষমা কইরা দেন। 

তারপর আসেন মাথা গোঁজার ঠাঁই বানানোর মহাযজ্ঞ—বিল্ডিং করার জন্য সালতামামি পারমিশন নেওয়া! একটা বাড়ি বানানোর জন্য প্ল্যান পাস করাইতে রাজউক আর তিতাসের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে মানুষের জুতার তলা ক্ষয় হয়া যায়। টেবিলের তলা দিয়া কত ‘কাগজ’ যে ওনাদের পকেটে চালান করতে হয়, তার কোনো হিসাব নাই। ওনারা এক ফাইল আটকায়া তিন বছর ঘুরাইলেও আমি কমু—"আহা! ওনারা তো আমার বাড়ির স্থায়িত্ব পরীক্ষা করার জন্য সময় নিচ্ছেন!" নিজের টাকায় জমি কিইন্যা, নিজের টাকায় ইট-বালু কিইন্যা ওনাদের পায়ে সালাম ঠুকমু, তাও ঘুষ শব্দটা মুখে আনমু না। আমায় ক্ষমা কইরা দেন ভাই, আমি ফুটপাতে থাকমু তাও ওনাদের কাজের ভুল ধরমু না।

আমি একদম ভালো মানুষ হয়া গেছি। চারপাশে যা-ই ঘটুক, আমি শুধু মাথা নাড়মু আর হাসমু। কোনো প্রতিবাদ নাই, কোনো প্রশ্ন নাই।

আমায় ক্ষমা কইরা দেন ভাই, আমায় ক্ষমা কইরা দেন।

স্যরি।

 

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator