অমানবিক জীবনযাপন ও বকেয়া বেতনের দাবিতে উত্তাল পোশাক শিল্প: শ্রমিকের… | আই নিউজ বিডি

অমানবিক জীবনযাপন ও বকেয়া বেতনের দাবিতে উত্তাল পোশাক শিল্প: শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত অর্থনীতির চাকা..

Akhter Hossain avatar   
Akhter Hossain
অমানবিক জীবনযাপন ও বকেয়া বেতনের দাবিতে উত্তাল পোশাক শিল্প: শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত অর্থনীতির চাকা..
অমানবিক জীবনযাপন ও বকেয়া বেতনের দাবিতে উত্তাল পোশাক শিল্প: শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত অর্থনীতির চাকা..
ছবি: সংগৃহীত
দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি পোশাক শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও বকেয়া বেতনের দাবিতে চলমান আন্দোলন এবং এর বিপরীতে পুলিশের দমন-পীড়নের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।..

দেশের পোশাক শিল্প খাতের শ্রমিকরা যখন তাদের দীর্ঘদিনের বকেয়া পাওনা ও জীবনধারণের উপযোগী মজুরির দাবিতে রাজপথে নামছেন, তখন তাদের ওপর চড়াও হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মূলত মাস শেষে হাতে পাওয়া সামান্য বেতনে আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, চিকিৎসা ব্যয় এবং সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটাতে হিমশিম খাওয়া শ্রমিকরা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই রাজপথে সরব হতে বাধ্য হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের ওপর গুলি, টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জের ঘটনা প্রমাণ করে যে, শ্রমিকের ন্যায্য দাবির বিপরীতে কর্তৃপক্ষের মনোভাব অত্যন্ত কঠোর। অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই কর্মজীবী মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর শোনার পরিবর্তে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খাতে এক অস্থির ও অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করছে, যা উন্নয়নের মূল দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক।

ভুক্তভোগী শ্রমিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, দিনের পর দিন ঘাম ঝরিয়ে তারা যে পণ্য উৎপাদন করেন, তার লভ্যাংশ মালিকপক্ষ ভোগ করলেও শ্রমিকের পাতে জুটছে না ন্যূনতম খাবার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শ্রমিক জানান, সন্তানদের ক্ষুধার্ত মুখ দেখার চেয়ে তাদের কাছে আর কোনো বড় যন্ত্রণা নেই, আর সেই কারণেই তারা জীবন বাজি রেখে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের মতে, মাস শেষে বেতন না পাওয়া বা অনিয়মিত মজুরি তাদের পরিবারকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মালিকপক্ষের উদাসীনতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক শ্রমিক এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। রাজপথে শ্রমিকের রক্তের দাগ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং কর্তৃপক্ষের প্রতি পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, যা প্রতিটি শিল্পাঞ্চলে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতির বিপরীতে শিল্প মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাচ্ছে। মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে প্রায়ই আর্থিক সংকটের কথা বলে মজুরি পরিশোধে গড়িমসি করার প্রবণতা দেখা যায়, যা শ্রমিকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটায়। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতি-উৎসাহী ভূমিকা এবং আলোচনার পরিবর্তে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেওয়া শ্রমিকদের আরও বেশি উগ্র করে তুলছে। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বিজিএমইএ-এর মতো নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলোকে অবশ্যই মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব নিরসনে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও পাওনা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি আরোপ করতে হবে।

শ্রমিকদের ওপর গুলি বা লাঠিচার্জ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং এটি দেশের শিল্প খাতের ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যদি শ্রমিকদের মুখে হাসি না ফোটে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত না হয়, তবে দেশের টেকসই উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। পোশাক শিল্পের স্থায়িত্ব বজায় রাখতে হলে শ্রমিকদের কেবল উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা না করে তাদের মানবিক অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায়, বারবার রাজপথে শ্রমিকের রক্ত ঝরার ঘটনা দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে, যার দায়ভার পরিশেষে রাষ্ট্র ও শিল্প মালিক কাউকেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবে না।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator