গাইবান্ধার একটি আবাসিক মাদ্রাসার কিশোরী শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হাসান আলী ডাক্তারকে (৬৯) গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১৩। গত ৩১ অক্টোবর রাতে পলাশবাড়ী উপজেলার ঢোলভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ আট বছর ধরে ওই মাদ্রাসাটিতে আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে অধ্যয়নরত ভুক্তভোগী কিশোরীকে গত ২৮ আগস্ট ভোরে মাদ্রাসাসংলগ্ন নিজ বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন অভিযুক্ত হাসান আলী। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত পরিচালক ভুক্তভোগীকে বিভিন্নভাবে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিলেন এবং তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার মাধ্যমে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালান। এসআরবি-১৩-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার গোস্বামী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ছয় মাস আগে থেকেই অভিযুক্ত হাসান আলী তাকে নানাভাবে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। মাদ্রাসার পরিবেশকে নিরাপদ মনে করে অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে সেখানে ভর্তি করলেও পরিচালকের এমন নৈতিক স্খলন পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ধর্ষণের ঘটনার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি কিশোরীকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে, বিষয়টি বাইরে জানাজানি হলে তাকে হত্যা ও গুম করা হবে। নিরুপায় কিশোরী দীর্ঘ সময় আতঙ্কে দিনাতিপাত করলেও পরবর্তীতে কৌশলে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঢাকায় অবস্থানরত তার বাবা-মাকে বিষয়টি অবগত করে। ১ সেপ্টেম্বর ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে গাইবান্ধা সদর থানায় ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হলে অভিযুক্ত হাসান আলী গা ঢাকা দেন। ভুক্তভোগীর পরিবারের ভাষ্যমতে, ধর্মের নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা তাদের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে এবং তারা এখন অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন।
গ্রেপ্তারের পর এসআরবি-১৩-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মামলা দায়েরের পর থেকেই অভিযুক্তকে ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনার দুই মাস পর পলাশবাড়ী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এবং এজাহারের অভিযোগ যাচাই করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্থানীয় এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের মতে, কওমি ও হাফেজিয়া মাদ্রাসাগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন ও প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় অনেক সময় অসাধু ব্যক্তিরা ধর্মীয় লেবাস ব্যবহার করে এমন জঘন্য অপরাধ করার সাহস পায়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই ধরনের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ঘটনাটি সামগ্রিকভাবে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও পরিচালনার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসায় অবস্থানরত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মালিকপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা এখানে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। অভিযুক্ত হাসান আলীর গ্রেপ্তার একটি প্রাথমিক আইনি জয় হলেও, এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী সুরক্ষা নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের মনে আস্থার সংকট নিরসনে বিচার বিভাগকে এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে, অন্যথায় শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।