সাতক্ষীরার ৪৭ বসতিতে ৭ হাজার ৫৭৩ বাস্তুচ্যুত পরিবার: স্থায়ী আবাসন… | আই নিউজ বিডি

সাতক্ষীরার ৪৭ বসতিতে ৭ হাজার ৫৭৩ বাস্তুচ্যুত পরিবার: স্থায়ী আবাসন নিশ্চিতে নতুন ফোরাম..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক: avatar   
শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক:
সাতক্ষীরার ৪৭ বসতিতে ৭ হাজার ৫৭৩ বাস্তুচ্যুত পরিবার: স্থায়ী আবাসন নিশ্চিতে নতুন ফোরাম..
সাতক্ষীরার ৪৭ বসতিতে ৭ হাজার ৫৭৩ বাস্তুচ্যুত পরিবার: স্থায়ী আবাসন নিশ্চিতে নতুন ফোরাম..
ছবি: সংগৃহীত
খাসজমিতে পুনর্বাসন ও উচ্ছেদ বন্ধের দাবি: সাতক্ষীরায় জলবায়ু বাস্তুচ্যুতদের ১১ দফা ঘোষণা..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ভিটেমাটি ও জীবিকা হারিয়ে শহরমুখী হওয়া মানুষের জন্য সরকারি খাসজমিতে স্থায়ী আবাসন এবং আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে সাতক্ষীরায়। একই সঙ্গে বিকল্প পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ বন্ধ, খাদ্য ও পুষ্টির অধিকার প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন জলবায়ু বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।

এসব দাবি বাস্তবায়নে জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাতক্ষীরায় গঠন করা হয়েছে ‘জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন ফোরাম’। নবগঠিত এ ফোরামের পক্ষ থেকে ১১ দফা দাবিসংবলিত ‘জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন ঘোষণাপত্র’ উপস্থাপন করা হয়েছে।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে সাতক্ষীরার মোজাফফর গার্ডেন অ্যান্ড রিসোর্টের স্বর্ণলতা ক্যানটিন হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ফোরামের সদস্য সচিব সোনিয়া খাতুন। সভাপতিত্ব করেন ফোরামের সভাপতি ফাতেমা বেগম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্ত।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় দুর্যোগ ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা গওহার নঈম ওয়ারা, পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড নেটওয়ার্কের (প্রান) প্রধান নির্বাহী নুরুল আলম মশাররফ, সিইপিআরের প্রধান নির্বাহী গোরাঙ্গ নন্দীসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, অধিকারকর্মী ও জলবায়ু বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।

ঘোষণাপত্রে বলা হয়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার ক্রমবর্ধমান প্রভাবে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার অসংখ্য পরিবার তাদের বসতভিটা, সম্পদ ও জীবিকার উৎস হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এসব পরিবারের একটি বড় অংশ নিরাপদ আশ্রয় ও জীবিকার সন্ধানে সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় এসে বসতি গড়তে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে পৌরসভার ৪৭টি অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আনুমানিক ৭ হাজার ৫৭৩টি বাস্তুচ্যুত পরিবার নানা সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

এসব পরিবারের অনেকেই নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসন, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষা এবং নিয়মিত আয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অনিশ্চিত বসবাসের পাশাপাশি উচ্ছেদের আশঙ্কা তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির পাশাপাশি নগরজীবনেও তারা নতুন করে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন।

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত ১১ দফা দাবির মধ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারি খাসজমিতে স্থায়ী আবাসন এবং বসবাসের আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। বিকল্প পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করে কোনো পরিবারকে উচ্ছেদ না করার দাবিও জানানো হয়।

এ ছাড়া নারী, পুরুষ ও তরুণদের জন্য শ্রমবাজার উপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ শর্তে ঋণ, শোভন আয়ের সুযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবি জানানো হয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি খাদ্যসহায়তা, ন্যায্যমূল্যে খাদ্য সরবরাহ ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

একই সঙ্গে শিশু ও মাতৃত্বকালীন পুষ্টিসেবা, নিরাপদ খাবার পানি, উন্নত স্যানিটেশন, মানসম্মত শিক্ষা এবং ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি তোলা হয়। বাস্তুচ্যুত মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার নিবন্ধনের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নগর উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় তাদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দের আহ্বান জানানো হয়।

ফোরামের সভাপতি ফাতেমা বেগম বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বস্ব হারিয়ে আজ আমরা নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে শহরের বসতিতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছি। আমরা কেবল কোনো ত্রাণ চাই না; নাগরিক হিসেবে নিরাপদ আবাসন, শোভন জীবিকা এবং খাদ্য-পুষ্টি আমাদের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার আদায়ে ফোরাম সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবে।”

ফোরামের সদস্য সচিব সোনিয়া খাতুন বলেন, “সাতক্ষীরা পৌরসভার ৪৭টি বসতিতে সাড়ে সাত হাজারের বেশি বাস্তুচ্যুত পরিবার সংকটের মধ্যে বসবাস করছে। আমাদের ১১ দফা দাবি কেবল আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। খাসজমিতে স্থায়ী আবাসন, উচ্ছেদ বন্ধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে এসব দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।”

স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্ত বলেন, “জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকার ঘোষিত ‘অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র ২০২১’ বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা কাজ করে যাব।”

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষ কোনো অনুগ্রহ বা করুণার ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী নন; তারা এ দেশের পূর্ণ নাগরিক। তাই তাদের আবাসন, খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকার নিশ্চয়তা দান রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের অধিকার সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে নবগঠিত ফোরামের নেতারা জানান, ১১ দফা দাবি বাস্তবায়ন এবং জাতীয় কৌশলপত্রের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করবেন তারা। তাদের প্রত্যাশা, জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষের সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন মানবিক সংকট হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেটে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator