বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানার নিয়োগ গত রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ১৩৮(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি তাঁকে এই সাংবিধানিক পদে নিয়োগ প্রদান করেন। দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর অথবা তাঁর বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত, এর মধ্যে যেটি আগে ঘটবে, সেই সময়কাল পর্যন্ত তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। নেত্রকোনার পূর্বধলা ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত সিরাজুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ সন্তান ড. শামীমা সুলতানার এই নিয়োগকে প্রশাসনিক ও একাডেমিক মহলে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পিএসসির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার লক্ষ্যেই এই নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ড. শামীমা সুলতানার একাডেমিক ক্যারিয়ার এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তাঁর এই নিয়োগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বাংলা বিভাগের সভাপতি এবং তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মধ্যযুগীয় ও আধুনিক বাংলা সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য এবং ছোটগল্প নিয়ে তাঁর গবেষণার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। তবে গত ১ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বিভাগীয় কার্যালয়ের দেয়াল থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি সরিয়ে ফেলার ঘটনাটি তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। সেই সময়কার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। এই সাহসী ও প্রতিবাদী অবস্থান তাঁর পেশাগত জীবনের নৈতিক দৃঢ়তারই প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মতে, পিএসসির মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে ড. শামীমা সুলতানার মতো ব্যক্তিত্বের অন্তর্ভুক্তি নিয়োগ প্রক্রিয়ার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা পিএসসির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নফাঁস বা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নিয়ে যে জনঅসন্তোষ তৈরি হয়, তা নিরসনে নতুন সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ড. শামীমা সুলতানার একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং প্রশাসনিক দক্ষতা পিএসসির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ফেরাতে সহায়ক হবে বলে আশা করছেন চাকরিপ্রার্থীরা। একই সঙ্গে, তিনি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে যে আস্থার সংকট রয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন কি না, তা নিয়ে এখন জনমনে প্রত্যাশা ও কৌতূহল উভয়ই বিদ্যমান।
পরিশেষে, ড. শামীমা সুলতানার এই নিয়োগ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি দেশের উচ্চশিক্ষা ও সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। শিক্ষকতা ও গবেষণার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা একজন নীতিনির্ধারক হিসেবে তাঁকে জনসেবার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেবে। পিএসসির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে মেধার ভিত্তিতে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের যে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কাজ করবেন, তা দেশের বেকার যুবসমাজের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। ভবিষ্যতে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলোই প্রমাণ করবে যে, এই নিয়োগের মাধ্যমে পিএসসির কার্যক্রমে কতটা ইতিবাচক ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।