বিয়ানীবাজারে সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টানবে কে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিয়ানীবাজারে সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টানবে কে?

Sabir Khan avatar   
Sabir Khan
বিয়ানীবাজারে সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টানবে কে?
বিয়ানীবাজারে সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টানবে কে?
ছবি: সংগৃহীত
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বাড়ছে প্রাণহানি, বেপরোয়া গতি ও ট্রাফিক আইন অমান্যে বাড়ছে উদ্বেগ..

মিসবাহ উদ্দিন | বিয়ানীবাজার, সিলেট:

 

সিলেটের বিয়ানীবাজারে সড়ক দুর্ঘটনা যেন থামছেই না। প্রতিনিয়ত সড়কে ঝরছে তাজা প্রাণ, মুহূর্তেই নিভে যাচ্ছে অসংখ্য সম্ভাবনা। কোনো দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার, আবার কোনো ঘটনায় অকালে ঝরে যাচ্ছে শিশু-কিশোর ও তরুণদের জীবন। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে দীর্ঘ জীবন কাটাতে হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ধারাবাহিক ঘটনা উপজেলাজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।

বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, ট্রাফিক আইন অমান্য, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং আগে যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অসচেতন চলাচল। ফলে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষই সড়কে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি

গত ১৩ অক্টোবর বিকেলে বিয়ানীবাজার পৌরশহরের দিঘিরপাড় এলাকায় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় হাসান আহমদ (১৪) নামে এক কিশোর নিহত হয়। এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ও দুপুরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান উপজেলার তিলপাড়া ইউনিয়নের মাটিজুরা গ্রামের মৃত আব্দুর রউফের ছেলে ফাহাদ আহমদ (২৩) এবং একই ইউনিয়নের ভরাউট গ্রামের বকতিয়ার মিয়ার ছেলে কামাল উদ্দিন (৩০)।

গত ৪ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার চারখাই এলাকায় ট্রাকের চাপায় এক মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়। একই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে শেওলা সেতুর টোল এলাকায় ট্রাকের চাপায় আরেক চালক ঘটনাস্থলেই মারা যান।

এ ছাড়া চারখাই এলাকায় ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে আবু বকর সাইফুল্লাহ (১৬) নামে এক কিশোর নিহত হয়। সে উপজেলার মাথিউরা ইউনিয়নের দুধবকশী গ্রামের বাসিন্দা। ওই ঘটনায় রাইহান আহমদ (২০) নামে আরও এক যুবক গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে সিলেটে পাঠানো হয়।

এর পরদিন বিকেল পৌনে ৫টার দিকে উপজেলার সাচান এলাকায় সিলেট-জকিগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের কাঠলী ব্রিজসংলগ্ন স্থানে আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে।

একের পর এক এসব দুর্ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। প্রতিদিন প্রয়োজনের তাগিদে সড়কে বের হওয়া মানুষ জানেন না, কখন একটি দুর্ঘটনা তাঁদের কিংবা তাঁদের পরিবারের জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে। বিশেষ করে তরুণ মোটরসাইকেল চালকদের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল এবং ভারী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ

সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। এর মধ্যে বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও অসতর্কতা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া তরুণদের একাংশের প্রতিযোগিতামূলক মোটরসাইকেল চালানো, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, সড়ক অবকাঠামোর ত্রুটি এবং ট্রাকসহ ভারী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণেও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে। মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো এবং পথচারীদের অসচেতনতাও দুর্ঘটনায় হতাহতের আশঙ্কা বাড়ায়।

বিশেষ করে আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাজারসংলগ্ন সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। এসব এলাকায় পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা করা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশক বসানোর বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

গতি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ সড়কের দাবি

বিয়ানীবাজারের সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল খালিক বলেন, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাজারের আশপাশে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সঙ্গে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশক নিশ্চিত করতে হবে।

বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবিরের মতে, অতিরিক্ত গতির কারণে চালক যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারালে দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনা কমাতে গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং চালকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহত হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সিলেট বিভাগে সেপ্টেম্বর মাসে নিহত ২৬

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটির সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে বিভাগের চার জেলার দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির চিত্র উঠে এসেছে।

রোববার (৪ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে সিলেট জেলায় আটটি সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন। সুনামগঞ্জে চারটি দুর্ঘটনায় দুজন নিহত ও ২৩ জন আহত হয়েছেন। মৌলভীবাজারে নয়টি দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে হবিগঞ্জে পাঁচটি দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চার জেলার মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মৌলভীবাজারে। সবচেয়ে কম নিহত হয়েছেন সুনামগঞ্জে। চার জেলায় মোট ২৬ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২২ জন পুরুষ, দুজন নারী ও দুজন শিশু।

প্রতিবেদনে মোটরসাইকেল এবং সিএনজি ও টমটমের চালক-আরোহীদের প্রাণহানির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি উল্টে যাওয়ার আটটি ঘটনায় ছয়জন, মুখোমুখি সংঘর্ষের আটটি ঘটনায় নয়জন এবং গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কার একটি ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন।

কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় স্থানীয়রা

সংশ্লিষ্টদের মতে, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য, দূরপাল্লার চালকদের ক্লান্তি ও অসতর্কতা এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ট্রাফিক অভিযান, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, চালকদের প্রশিক্ষণ, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং আইন প্রয়োগে কঠোরতা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ব্যবহার, বৈধ লাইসেন্স নিশ্চিত করা এবং তরুণদের মধ্যে নিরাপদ চালনার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পুলিশ, পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিরা সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আর কোনো পরিবার যেন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রিয়জন হারিয়ে নিঃস্ব না হয়—এমন প্রত্যাশা বিয়ানীবাজারবাসীর।

প্রশ্ন একটাই—বিয়ানীবাজারের সড়কে প্রাণহানির এই মিছিল থামবে কবে? সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টানতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে কে?

Nema komentara


News Card Generator