ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি’র দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। দিল্লির যন্তর মন্তরের মতো ঐতিহাসিক প্রতিবাদস্থলে নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরও সেখানে প্রবেশের দায়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গত এক সপ্তাহ তিহার কারাগারে বন্দি থাকার পর দিল্লির এক বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আদেশে তারা মুক্তি পান। মূলত, ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং ভোটার তালিকা সংশোধনে কারসাজির অভিযোগ নিয়ে সরব হওয়ার কারণেই এই তরুণ নেতাদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারাগার থেকে বেরিয়ে সৌরভ দাস সাংবাদিকদের কাছে নিজের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন যে, সত্যেরই শেষ পর্যন্ত জয় হয় এবং তাদের এই বিপ্লব অব্যাহত থাকবে। মূলত যন্তর মন্তরের তালাবদ্ধ গেট টপকে ভেতরে প্রবেশের ঘটনাটি ছিল নির্বাচন কমিশনের কার্যপদ্ধতির প্রতি তাদের চরম ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
গ্রেপ্তারকৃত দুই নেতার সমর্থক এবং সিজেপি’র অন্যান্য সদস্যদের অভিযোগ, ভারতের বর্তমান ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন বিজেপিকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যদিও নির্বাচন কমিশন বরাবরই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে, তবুও তরুণ প্রজন্মের এই অংশটি নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে অনড়। এই আন্দোলনের মূলে রয়েছে তথাকথিত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে গত এক বছরে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী ও সমালোচকদের মতে, এই প্রক্রিয়ার আড়ালে যোগ্য ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র চলছে, যা গণতান্ত্রিক ভোটাধিকারকে সংকুচিত করছে। সিজেপি নেতারা দাবি করছেন যে, এই ব্যাপক ভোটার তালিকা ছাঁটাইয়ের ফলে লক্ষ লক্ষ সাধারণ নাগরিক তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন, যা কোনোভাবেই একটি সুস্থ নির্বাচনী ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না।
ঘটনার প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থানে কঠোর রয়েছে। কমিশনের ভাষ্যমতে, ভোটার তালিকা থেকে মৃত, দ্বৈত বা অযোগ্য ভোটারদের নাম অপসারণ করাই এই বিশেষ প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য, এতে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। অন্যদিকে, সিজেপি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল না হয়েও যেভাবে ভারতের তরুণ সমাজকে একত্রিত করছে, তা সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মে মাসে শীর্ষ আদালতের একজন বিচারক বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সাথে তুলনা করার পর এই গোষ্ঠীর জন্ম হয়, যা পরবর্তীতে প্রশ্নপত্র ফাঁস বিরোধী আন্দোলনেও বড় ভূমিকা রাখে। জুলাই মাসে পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রার সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং পরবর্তীতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা এই গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাবকে স্পষ্ট করে দেয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আন্দোলনকে দমন করার প্রবণতা অব্যাহত থাকলেও, তরুণদের এই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পরিশেষে, সিজেপি নেতাদের মুক্তি পেলেও ভারতের নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা অদূর ভবিষ্যতে আরও ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে নির্বাচন কমিশনের আইনি সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রভাব, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের দাবি—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তার নিরসন না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলনের উত্তাপ সহজে কমার কোনো লক্ষণ নেই। এই পরিস্থিতি ভারতের আগামী নির্বাচনী পরিবেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে এবং নাগরিক অধিকার ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।