খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার থুকড়া এলাকায় গত শনিবার সকালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ অভিযানে মিজানুর রহমান হিরো নামের চল্লিশ বছর বয়সী এক মাদক ব্যবসায়ীকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোহেল রানার নেতৃত্বে পরিচালিত এই ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘটনাস্থলেই অভিযুক্তকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর খুলনার ‘খ’ সার্কেলের একটি দল সাহাপুর, হাসানপুর, মিকসিমিল ও থুকড়াসহ ডুমুরিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তল্লাশি চালায়। অভিযানের এক পর্যায়ে থুকড়া এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ অ্যালকোহলসহ মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা ওই অঞ্চলে চলমান মাদক কারবারের একটি বড় নেটওয়ার্কের অস্তিত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ স্থানীয় পর্যায়ে মাদক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন ধরে ডুমুরিয়ার বিস্তীর্ণ জনপদে মাদক ব্যবসার প্রসারে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল বলে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে থুকড়া ও এর পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের ভয়াবহ থাবা বিস্তার লাভ করায় অভিভাবক মহলে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, মিজানুর রহমান হিরোর মতো প্রভাবশালী মাদক কারবারিরা কৌশলে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, সে দীর্ঘদিন ধরে সুকৌশলে অ্যালকোহলসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য তরুণ প্রজন্মের কাছে সরবরাহ করে আসছিল, যা এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করার পাশাপাশি যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই অভিযানে উপস্থিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ধৃত ব্যক্তি মাদক বিক্রির সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে এবং তার এই অপকর্মের ফলে স্থানীয় এলাকায় মাদকের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকিস্বরূপ ছিল।
অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোহেল রানা জানান, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন সর্বদা তৎপর রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর খুলনার ‘খ’ সার্কেলের উপ-পরিদর্শক জাহানারা খাতুন, সহকারী উপ-পরিদর্শক আব্দুল হালিম এবং উপজেলা ভূমি অফিসের নাজির কিরণ বালাইসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সদস্যরা সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কেবল গ্রেপ্তার বা সাজা প্রদানই নয়, বরং মাদকের উৎসস্থল নির্মূলে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। স্থানীয় বাসীন্দাদের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছে যে, এই মাদক ব্যবসায়ীদের গডফাদারদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে এবং মাদকের সাথে জড়িত অন্য কোনো চক্রের যোগসাজশ থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদকবিরোধী এই অভিযান ডুমুরিয়া অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি ফিরিয়ে আনলেও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীদের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত এবং তারা কীভাবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই দণ্ডাদেশ কেবলমাত্র একজন মাদক ব্যবসায়ীকে সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় করেছে, কিন্তু মাদকের চাহিদাও যোগান বন্ধ করতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সচেতনতা এবং প্রশাসনের নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। যদি নিয়মিত বিরতিতে এ ধরনের কঠোর অভিযান পরিচালিত না হয়, তবে মাদক কারবারিরা পুনরায় নতুন কোনো কৌশল অবলম্বন করে তাদের ব্যবসা পুনর্গঠন করতে পারে, যা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবেই থেকে যাবে। তাই প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।