আব্দুল কাইয়ুম নাহিদ ,সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি :
মসলিন আর জামদানির জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের সেই গৌরবময় ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে আছে এ জনপদের আরেক শতবর্ষী লোকশিল্প - ‘গুনার নেট’ শিল্প। লোহার সূক্ষ্ম তারের তৈরি চালুন ও জালি শিল্পটি একসময় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতো। ব্রিটিশ আমল থেকে আশির দশক পর্যন্ত ছিল এর স্বর্ণযুগ। অথচ কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, সস্তা প্লাস্টিক পণ্যের আগ্রাসন এবং সংঘবদ্ধ চোর চক্রের দৌরাত্ম্যে শিল্পটি আজ বিলুপ্তির চূড়ান্ত প্রান্তে।
সম্প্রতি সোনারগাঁয়ের পৌরসভা, মোগরাপাড়া, বৈদ্যেরবাজার ও সনমান্দী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে হতাশার চিত্র। যে গ্রামগুলোর প্রতিটি বাড়ি থেকে একসময় ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভেসে আসতো গুনা কাটা আর নেট বোনার একটানা খটখট শব্দ, সেখানে এখন সুনসান নীরবতা। অনুসন্ধানে জানা যায়, একসময় এই তিন ইউনিয়নে পাঁচ শতাধিক পরিবার এই পেশার সাথে জড়িত ছিল। এখন তা টিকে আছে হাতেগোনা ৩০-৪০টি পরিবারে।
স্থানীয় ভাষায় লোহার বা তামার অতি সূক্ষ্ম তারকে বলা হয় ‘গুনা’। কারিগররা বিশেষ কায়দায় কাঠের ফ্রেমে হাতের নিপুণতায় বুনে তৈরি করেন মাছ ধরার জালি, ধান-চাল ও বালু চালার বিভিন্ন মাপের চালুন এবং বাড়িঘরের নিরাপত্তা বেড়া। সম্পূর্ণ হাতে তৈরি হওয়ায় এর স্থায়িত্ব ও মজবুতি প্লাস্টিকের চেয়ে অনেক বেশি।
এই শিল্পের বিপর্যয়ের প্রধান কারণ বাজারে সস্তা প্লাস্টিকের জালি ও চালুনের সহজলভ্যতা। দামে সস্তা হওয়ায় ক্রেতারা ঝুঁকছেন প্লাস্টিক পণ্যের দিকে। ফলে তুলনামূলক দামি ও শ্রমনির্ভর লোহার নেটের চাহিদা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। অনেকেই পুঁজি হারিয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে।
সোনারগাঁয়ের খাসনগর দিঘীরপাড় এলাকার বিশিষ্ট গুনার নেট ব্যবসায়ী শাহ- আলী বলেন, “একটা সময় ছিল যখন আমাদের এই এলাকা থেকে প্রতিদিন শত শত পিস গুনার নেট ও চালুন ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন জেলায় চালান হতো। আমরা কারিগরদের মাসের পর মাস অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখতাম মাল তৈরির জন্য। এখন চিত্র উল্টো। কাঁচামাল হিসেবে লোহার তারের দাম গত কয়েক বছরে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে আমরা নেটের দাম বাড়াতে পারিনি। প্লাস্টিক আসার পর থেকে আমাদের মাল কেউ কিনতে চায় না। বেচাবিক্রি না থাকায় কারিগররা বাধ্য হয়ে রিকশা চালানো, ইটভাটা বা দিনমজুরির মতো অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। সরকার যদি সহজ শর্তে ঋণ ও বাজার তৈরির ব্যবস্থা না করে, তবে এই ঐতিহ্য আর টিকবে না।”
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে চুরি আতঙ্ক, অভাবের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে চুরি আতঙ্ক। কাঁচামালের দাম চড়া হওয়ায় চোর চক্রের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে কারিগরদের ঘর ও ছোট কারখানা।
দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত প্রবীণ কারিগর মো: আলী হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্লাস্টিকের দাপটে এমনিতেই আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যে চালুন বানাই, তা দিয়ে সংসার চালানোই দায়। তার ওপর গত কয়েক মাস ধরে এলাকায় রাতের বেলা চোরের উপদ্রব মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। চোরেরা রাতের আঁধারে ঘর থেকে আমাদের জমানো মূল্যবান লোহার গুনা আর তৈরি করে রাখা নেট চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। বাজারে লোহার দাম বেশি, তাই এই তার সহজেই বিক্রি করা যায়। এক বস্তা তার চুরি হলে আমাদের কয়েক মাসের পুঁজি এক রাতে শেষ হয়ে যায়। একদিকে অভাব, অন্যদিকে চুরির আতঙ্কে আমরা এখন নির্ঘুম রাত কাটাই।”
এলাকাবাসী, ব্যবসায়ী ও লোকশিল্প গবেষকদের মতে, এই শিল্পকে বাঁচাতে দ্রুত সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। তাদের দাবিগুলো হলো -
নিরাপত্তা জোরদার: কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য চুরি রোধে সোনারগাঁ পৌরসভা, মোগরাপাড়া, বৈদ্যেরবাজার ও সনমান্দী এলাকায় নৈশকালীন পুলিশি টহল বৃদ্ধি করতে হবে।
আর্থিক প্রণোদনা: প্রকৃত কারিগরদের তালিকা করে সহজ শর্তে সুদমুক্ত ঋণ ও ভর্তুকি প্রদান।
কাঁচামালের ন্যায্যমূল্য: সরকারিভাবে কাঁচামাল আমদানি ও সরবরাহ নিশ্চিত করে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা।
বাজার সৃষ্টি: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, লোকশিল্প মেলায় ‘গুনার নেট’ পণ্যের জন্য আলাদা স্টল ও ব্র্যান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এই পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মসলিনের মতো সোনারগাঁয়ের গৌরবময় ঐতিহ্যের আরেক জীবন্ত সাক্ষী ‘গুনার নেট’ শিল্পটিও কালের গর্ভে চিরতরে হারিয়ে যাবে।