জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান। বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের চরম উত্তেজনার মুহূর্তে ১৯ জুলাই যখন সারা দেশে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটছিল, ঠিক সেই সময়ে আন্দোলনের দুই শীর্ষ নেতা সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। রাশেদ খানের ভাষ্যমতে, এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সারজিস আলমকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছিলেন এবং হাসনাত আব্দুল্লাহকে শোকজ নোটিশ প্রদান করেছিলেন। এই ঘটনাটি আন্দোলনের মূল স্পিরিট এবং শহীদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি, যা বর্তমানে আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে জনসম্মুখে নিয়ে এসেছে।
ভুক্তভোগী ও সমালোচকদের মতে, ওই সময়ে সরকার পতনের এক দফা দাবি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, তখন নেতৃত্বের এই দ্বিমুখী অবস্থান সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। রাশেদ খানের অভিযোগ অনুযায়ী, হাসনাত আব্দুল্লাহ তৎকালীন সময়ে হাসিব আল ইসলামসহ অন্য নেতাদের মেস থেকে ডেকে নিয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। রাশেদ খান দাবি করেন যে, শহীদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে অনেক শিক্ষার্থীই সেই প্রলোভনে পা দেননি এবং বৈঠকে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি আরও দাবি করেন, আন্দোলনের সময় আব্দুল কাদেরের উত্থাপিত ৯ দফার যৌক্তিক আন্দোলনকে বিতর্কিত করতে এবং তা বানচাল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ৮ দফার একটি বিকল্প কর্মসূচি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই প্রক্রিয়াটি ছিল মূলত গণ-আন্দোলনকে নস্যাৎ করার একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র, যার নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান সময়ের আলোচিত এই দুই সমন্বয়ক।
সংশ্লিষ্ট এই অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সারজিস আলম বা হাসনাত আব্দুল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক পাল্টা বিবৃতি পাওয়া যায়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। তবে নেত্র নিউজের একটি প্রতিবেদনের সূত্র ধরে রাশেদ খান যে দাবি করেছেন, তাতে আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে এই গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে আন্দোলনের ইতিহাস থেকে আব্দুল কাদেরের মতো নেতাদের নাম মুছে ফেলার চেষ্টার বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো তদন্তের ঘোষণা না এলেও, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই তথ্যগুলো আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর সন্দেহের উদ্রেক করছে। বিশেষ করে দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যখন আন্দোলনের মূল নেতাদের দিকেই নির্দেশ করছে, তখন এর একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ও সত্যতা যাচাই করা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিশেষে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো একটি ঐতিহাসিক ঘটনার নেপথ্য কাহিনী নিয়ে এই ধরনের বিতর্ক আন্দোলনের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ঝুঁকি তৈরি করছে। রাশেদ খানের এই বিস্ফোরক দাবি যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতাকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেবে। একইসঙ্গে, আন্দোলনের সময়কার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং এর পেছনে থাকা অদৃশ্য শক্তির প্রভাব নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তা অদূর ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মেরুকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সাধারণ মানুষ এখন আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস এবং নেতাদের স্বচ্ছতার বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রয়েছে, অন্যথায় এই বিতর্ক দীর্ঘমেয়াদে দেশের ছাত্র রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।