বুয়েটের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক: সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা লিখছেন নাইলা সারাফ লিজা.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বুয়েটের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক: সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা লিখছেন নাইলা সারাফ লিজা..

Md MR Uzzal avatar   
Md MR Uzzal
বুয়েটের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক: সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা লিখছেন নাইলা সারাফ লিজা..
বুয়েটের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক: সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা লিখছেন নাইলা সারাফ লিজা..
ছবি: সংগৃহীত
প্রকৌশলী ও ব্যাংকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার ছেড়ে নেত্রকোনার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নিয়ে শিশুদের স্বপ্নের সারথি হয়েছেন বুয়েট গ্র্যাজুয়েট নাইলা সারাফ লিজা।..

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী নাইলা সারাফ লিজা প্রচলিত ধারার ক্যারিয়ার সচেতনতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে। নেত্রকোনা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত লিজা মূলত প্রকৌশল ও ব্যাংকিং খাতের উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ২০০৯ সালে এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী এবং পরবর্তীতে জনতা ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করলেও, পেশাগত জীবনের সেই গণ্ডি তাঁকে মানসিক তৃপ্তি দিতে ব্যর্থ হয়। অবশেষে ২০১৭ সালে তিনি শিক্ষকতায় যোগ দিয়ে নিজেকে শিশুদের বিকাশের কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। লিজার এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি পেশা বদলের ঘটনা নয়, বরং উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের প্রাথমিক শিক্ষা খাতের প্রতি আগ্রহের একটি বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের শুরুর দিকে লিজাকে মফস্বল এলাকার পরিবেশ ও যাতায়াত ব্যবস্থার মতো বাস্তব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়েছে। প্রথম তিন মাস তাঁর মনে পেশাগত এই পরিবর্তন নিয়ে সংশয় থাকলেও, শিক্ষার্থীদের সরলতা এবং সহকর্মীদের আন্তরিক সহযোগিতা তাঁকে এই পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করেছে। ভুক্তভোগী বা প্রতিকূলতার বিপরীতে তিনি যে ধৈর্য দেখিয়েছেন, তা স্থানীয় পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছে। লিজার মতে, বড় ডিগ্রি থাকলেই ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না, বরং শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারা এবং তাদের ভেতর থেকে শেখার আগ্রহ জাগিয়ে তোলাই হলো আসল চ্যালেঞ্জ। তিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে শিশুদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং তাদের সৃজনশীল বিকাশে কাজ করছেন, যা প্রচলিত মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা পদ্ধতির চেয়ে ভিন্নধর্মী এক অভিজ্ঞতার জন্ম দিচ্ছে।

লিজার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, প্রাথমিক স্তরে দক্ষ ও মেধাবী জনবলের অংশগ্রহণ শিক্ষার মানোন্নয়নে অপরিহার্য। লিজা নিজেই স্বীকার করেছেন যে, শিক্ষককে কেবল শাসনকারী নয়, বরং বন্ধুর ভূমিকা পালন করতে হয় যাতে শিশুরা নির্ভয়ে ভুল করার সুযোগ পায়। তাঁর এই বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি দূর করে শেখার পরিবেশকে আনন্দময় করে তুলেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ লিজার এই সৃজনশীল পাঠদান প্রক্রিয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা খাতে এমন নিবেদিতপ্রাণ ও আধুনিক শিক্ষাবিদদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে কর্মপরিবেশের আধুনিকায়ন এবং শিক্ষকদের প্রণোদনা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

পরিশেষে, নাইলা সারাফ লিজার গল্পটি পেশাগত সাফল্যের প্রচলিত সংজ্ঞাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। রাজধানীর যান্ত্রিক জীবন ছেড়ে শেকড়ের কাছে ফেরা এবং শিশুদের স্বপ্ন দেখানোর এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, প্রকৃত সাফল্য পদমর্যাদায় নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যে নিহিত। তাঁর এই আত্মিক সম্পৃক্ততা কেবল পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জীবনেই প্রভাব ফেলছে না, বরং উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের কাছে শিক্ষকতাকে একটি সম্মানজনক ও সেবামূলক পেশা হিসেবে নতুন করে উপস্থাপন করছে। ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষা খাতের গুণগত পরিবর্তনে লিজার মতো ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ একটি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়।

No comments found


News Card Generator