অভিযানে হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রায় ৯ কোটি টাকা মূল্যের ক্যাথল্যাব যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, যন্ত্রটি চালু করে বুঝিয়ে দেওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে শুরু হওয়া এ অভিযান রাত পর্যন্ত চলে। ফরিদপুর জেলা সমন্বিত দুর্নীতি দমন কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মোস্তাফিজের নেতৃত্বে দুদকের আট সদস্যের একটি দল অভিযানে অংশ নেয়। অভিযান শেষে রাত ৮টার পর বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়।
রোগীদের অভিযোগ, সেবায় নানা ভোগান্তি
অভিযান চলাকালে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন দুদক কর্মকর্তারা। এ সময় তাঁরা চিকিৎসাসেবা পেতে নানা ধরনের হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেন।
রোগীদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে না পারা, টাকা ছাড়া ট্রলি না পাওয়া, সময়মতো চিকিৎসকের দেখা না পাওয়া এবং সরকারি ওষুধ থেকে বঞ্চিত হওয়া। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদকের কর্মকর্তারা সরেজমিনে খোঁজখবর নেন।
হাস্পাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা মূল্যের ক্যাথল্যাব যন্ত্রের কার্যকারিতা ও ক্রয়সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ‘ফিলিপস ইলেকট্রনিকস বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড’-এর মাধ্যমে যন্ত্রটি কেনা হয়। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যন্ত্রটি বুঝে নেয়।
যন্ত্রটি স্থাপন করা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা চালু করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অথচ ক্যাথল্যাবের মাধ্যমে হৃদরোগীদের এনজিওগ্রাম, হার্টে রিং পরানোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
চালুর আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের অভিযোগ
অভিযান চলাকালে দুদক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইলেকট্রো মেডিকো টেকনিশিয়ান মাঈনুল ইসলাম জানান, যন্ত্রটি স্থাপনের পর চালু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু তৎকালীন কর্তৃপক্ষ যন্ত্রটি চালু না করেই প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করে দেয় বলে তিনি দাবি করেন।
তবে যন্ত্রটি চালু না করেই কেন সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
মাঈনুল ইসলাম আরও জানান, ক্যাথল্যাব যন্ত্রটি চালুর বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ১১ মার্চ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এ-সংক্রান্ত একটি চিঠির অনুলিপিও দুদক কর্মকর্তাদের সামনে উপস্থাপন করেন।
ক্রয় ও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগও তদন্তে
দুদক সূত্রে জানা গেছে, শুধু ক্যাথল্যাব যন্ত্র নয়, হাসপাতালের মালামাল ক্রয়, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া দালাল চক্রের মাধ্যমে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ফরিদপুরের সহকারী পরিচালক মো. মোস্তাফিজ জানান, রোগীদের হয়রানি, চিকিৎসাসেবায় অনিয়ম, দালাল চক্রের তৎপরতা, আউটসোর্সিং নিয়োগ এবং মালামাল ক্রয়-বিক্রয়সহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রায় ৯ কোটি টাকার একটি অত্যাধুনিক চিকিৎসাযন্ত্র দীর্ঘদিন চালু না থাকার অভিযোগ এবং রোগীদের ভোগান্তির বিষয়টি এখন দুদকের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।