দুই হাত নেই, পায়ের আঙুলেই গড়ছেন শিক্ষার আলো; দুখু মিয়ার পাশে জেলা প্রশাসক.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

দুই হাত নেই, পায়ের আঙুলেই গড়ছেন শিক্ষার আলো; দুখু মিয়ার পাশে জেলা প্রশাসক..

Ratna Begum avatar   
Ratna Begum
দুই হাত নেই, পায়ের আঙুলেই গড়ছেন শিক্ষার আলো; দুখু মিয়ার পাশে জেলা প্রশাসক..
দুই হাত নেই, পায়ের আঙুলেই গড়ছেন শিক্ষার আলো; দুখু মিয়ার পাশে জেলা প্রশাসক..
ছবি: সংগৃহীত
দুই হাত নেই, পায়ের আঙুলেই গড়ছেন শিক্ষার আলো; দুখু মিয়ার পাশে জেলা প্রশাসক

রিপোর্ট: রত্না বেগম

দুই হাত নেই, তবু থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। পায়ের আঙুলে চক ধরে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখেন, পা দিয়ে বইয়ের পাতা উল্টে পড়ান কোমলমতি শিশুদের। নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন নরসিংদীর পাঁচদোনার আলতাফ হোসেন ওরফে ‘দুখু মিয়া’। তবে আর্থিক সংকটে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি বড় করার স্বপ্ন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। এবার সেই স্বপ্নপূরণের আশার আলো নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে দুখু মিয়ার প্রতিষ্ঠিত ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’ বিদ্যালয়ে ছুটে যান জেলা প্রশাসক। সেখানে তিনি দুখু মিয়ার জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের প্রতি সম্মান জানান। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুখু মিয়ার হাতে আর্থিক অনুদান তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিশুদের মধ্যে বিতরণ করা হয় স্কুলব্যাগ, খেলার সামগ্রী ও পরিবেশের প্রতি সচেতনতা বাড়াতে গাছের চারা।

নতুন স্কুলব্যাগ ও উপহার পেয়ে শিশুদের মুখে ফুটে ওঠে আনন্দের হাসি। আর জেলা প্রশাসকের এই উপস্থিতি দুখু মিয়ার দীর্ঘদিনের সংগ্রামে যোগ করে নতুন আশার আলো।

নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনা এলাকার একটি জীর্ণ টিনশেড শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিন চলে পাঠদান। ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে বসে বা দাঁড়িয়ে পায়ের আঙুলে চক ধরে শিক্ষার্থীদের পড়ান দুখু মিয়া। দুই হাত না থাকলেও পাঠদানে তাঁর নেই কোনো ক্লান্তি, নেই দায়িত্ব পালনে কোনো আপস। প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীর কাছে তিনি শুধু শিক্ষক নন, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও সাহসের এক অনন্য উদাহরণ।

জন্ম থেকেই দুই হাতবিহীন দুখু মিয়ার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল নানা বাধা পেরিয়ে। শৈশবে মাদ্রাসায় ভর্তি হতে গিয়ে পা দিয়ে বই ধরতে পারবেন না—এমন কারণ দেখিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাখ্যান তাঁকে দমাতে পারেনি। বাবা-মায়ের সহযোগিতায় কলাপাতায় পাতিলের কালি দিয়ে পা দিয়ে লেখার হাতেখড়ি হয় তাঁর। কঠোর অধ্যবসায় ও অদম্য মনোবলে ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন তিনি।

উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে একাধিক সরকারি-বেসরকারি চাকরির সুযোগ হাতছাড়া হয়। তবু হতাশ হয়ে বসে থাকেননি। অন্যের কাছে চাকরির প্রত্যাশা না করে ২০০৭ সালে পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’। সেই থেকে নিজের সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে পরিণত করে শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ বাড়ানো এবং বিদ্যালয়টিকে আরও বড় পরিসরে গড়ে তোলাই এখন দুখু মিয়ার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। কিন্তু অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ সম্ভব হচ্ছে না। জেলা প্রশাসককে কাছে পেয়ে নিজের সেই স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন তিনি। আর্থিক সংকটের কথা জানিয়ে বিদ্যালয়টিকে একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন।

দুখু মিয়ার কথা শুনে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া তাঁর পাশে থাকার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া শুধু নরসিংদীর নন, পুরো দেশের গর্ব। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও স্বপ্নকে মাঝপথে থমকে যেতে দেওয়া হবে না। বিদ্যালয়টিকে উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও দাপ্তরিক উদ্যোগ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত গ্রহণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন ও সরকার সর্বাত্মকভাবে পাশে থাকবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।

নিজের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসককে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দুখু মিয়া। দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও নানা জায়গায় সহযোগিতা চেয়েও প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁর জীবনে এটি অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর অনেক জায়গায় গিয়েছেন, অনেকের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েছেন; কিন্তু জেলা প্রশাসক নিজে বিদ্যালয়ে এসে সহযোগিতা করবেন, এমন অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম।

তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসকের আগমনের পর তাঁর মনে হচ্ছে, উচ্চবিদ্যালয় গড়ে তোলার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এবার বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে।

কর্মসূচিতে নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা জাহান সরকার, সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেফতাহুল হাসান, পাঁচদোনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বাচ্চু মিয়া, সাধারণ সম্পাদক তারিক হোসেন রানাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।

দুই হাত ছাড়াই জীবন গড়ার সংগ্রাম থেকে শতাধিক শিশুর শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়া—দুখু মিয়ার এই পথচলা প্রমাণ করে, মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে রাখা যায় না সহজে। এখন তাঁর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় টিনশেডের ছোট্ট বিদ্যালয়টি একদিন পূর্ণাঙ্গ উচ্চবিদ্যালয়ে রূপ নেবে, আর এলাকার আরও অনেক শিশু পাবে শিক্ষার বিস্তৃত সুযোগ।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator