ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে শনিবার নয়াদিল্লিতে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন দমন-পীড়ন চালিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তরুণদের সংগঠন ‘ককরোচ পার্টি’ এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল। বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান যন্তর মন্তরের দিকে অগ্রসর হওয়ার আগেই পুলিশ রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে এবং হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে শহরের প্রবেশপথগুলোতে চেকপয়েন্ট বসিয়ে বিক্ষোভকারীদের চিহ্নিত করা হয়। পুলিশের এই পরিকল্পিত অভিযানের ফলে আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই অকার্যকর হয়ে পড়ে, যা ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসরে ভিন্নমত দমনের একটি চরম দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষিত হচ্ছে।
বিক্ষোভ দমনে পুলিশের এই অতি-তৎপরতার শিকার হয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিরোধী দলীয় আইনপ্রণেতারাও। মুম্বাই থেকে দিল্লি বিমানবন্দরে অবতরণের পরপরই আন্দোলনের শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কাকে সরাসরি বিমান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগী বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকারকে পুলিশি শক্তির মাধ্যমে পদদলিত করা হয়েছে। তানিয়া নেগির মতো অনেক শিক্ষার্থী প্রশ্ন তুলেছেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেন যৌক্তিক দাবির পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের রোষানলে পড়তে হচ্ছে। যন্তর মন্তর এলাকায় ব্যারিকেড, টিয়ার গ্যাস লঞ্চার ও দাঙ্গা-বিরোধী যানবাহন মোতায়েন করে পুরো এলাকাকে কার্যত একটি অবরুদ্ধ জনপদে পরিণত করা হয়, যেখানে সাংবাদিকদেরও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
এদিকে, এই দমন-পীড়নের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বিক্ষোভকারীদের ‘নৈরাজ্যবাদী উপাদান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং তাদের কর্মসূচিকে ব্যর্থ হিসেবে দাবি করেছেন। নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ভোটার তালিকা থেকে ডুপ্লিকেট বা অযোগ্য নাম বাদ দেওয়ার জন্যই এই সংশোধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা কোনোভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। তবে বিরোধী দলীয় নেতারা এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছেন যে, ভোটার তালিকা কারচুপির মাধ্যমে মোদী সরকার আসন্ন নির্বাচনগুলোকে নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার অপচেষ্টা করছে। জন ব্রিটাসসহ বিরোধী দলীয় আইনপ্রণেতাদের আটক ও হেনস্তার ঘটনা প্রমাণ করে যে, সরকার ভিন্নমতের প্রতি কতটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। প্রশাসন দাবি করছে যে, বিক্ষোভের অনুমতি না থাকায় জননিরাপত্তা রক্ষায় তারা কঠোর হতে বাধ্য হয়েছে।
ভোটার তালিকা নিয়ে এই চলমান বিতর্ক কেবল একটি প্রশাসনিক জটিলতা নয়, বরং এটি ভারতের নির্বাচনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া এবং এর বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের এই জোরালো প্রতিবাদ মোদী সরকারের ওপর জনদৃষ্টি ও সমালোচনার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। জুলাই মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আন্দোলনের পর পুনরায় এই ‘ককরোচ’ আন্দোলনের উত্থান নির্দেশ করে যে, ভারতের তরুণ সমাজ এখন রাজনৈতিকভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও সোচ্চার। তবে রাষ্ট্রযন্ত্রের এমন কঠোর দমননীতি ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চাকে আরও সংকুচিত করবে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংঘাতময় পরিস্থিতি ভারতের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।