শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে খুলনা ও ফরিদপুর জেলাসহ দেশ-বিদেশের সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন পার্থ কুমার দাস। তিনি শারদীয় দুর্গোৎসবের পবিত্রতা, ধর্মীয় তাৎপর্য ও চিরন্তন মহিমা তুলে ধরে সবার জীবনে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি, কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
এক শুভেচ্ছা বার্তায় পার্থ কুমার দাস বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসব শুধু আনন্দ, আয়োজন ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, আধ্যাত্মিক চেতনা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, মানবকল্যাণ এবং অশুভ শক্তির বিনাশের এক চিরন্তন শিক্ষা। দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস, শৌর্য, ন্যায় ও কল্যাণের প্রতীক। তাঁর পূজার মধ্য দিয়ে ভক্তরা অন্যায়, অহংকার, লোভ, হিংসা ও অশুভ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা লাভ করেন।
তিনি বলেন, হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও পুরাণ অনুসারে, দেবী দুর্গা মহিষাসুর নামক অসুরকে পরাজিত করে দেবতা ও বিশ্বজগতকে অশুভ শক্তির অত্যাচার থেকে রক্ষা করেন। মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার এই মহিমা যুগে যুগে সত্য ও ন্যায়ের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই পৌরাণিক কাহিনির অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো—অন্যায়, অত্যাচার ও অহংকার যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সত্য, ন্যায় ও শুভ শক্তির কাছে তার পরাজয় অনিবার্য। তাই দুর্গাপূজা আমাদের অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়।
পার্থ কুমার দাস আরও বলেন, দেবী দুর্গার দশভুজা রূপ বহুমুখী শক্তি, সাহস ও কর্মক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর হাতে ধারণ করা বিভিন্ন অস্ত্র ও প্রতীক অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ধর্ম ও ন্যায় রক্ষার তাৎপর্য বহন করে। দেবী দুর্গার সিংহ সাহস, শক্তি ও নির্ভীকতার প্রতীক। এই প্রতীকী তাৎপর্য আমাদের জীবনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দেবী দুর্গার এই আদর্শ ব্যক্তিজীবন, পরিবার ও সমাজে বাস্তবায়ন করাই হওয়া উচিত পূজার অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, সনাতন ধর্মের মূল শিক্ষার মধ্যে রয়েছে সত্য, ধর্ম, দয়া, সংযম, ত্যাগ, পরোপকার ও জীবের প্রতি মমত্ববোধ। ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল আচার-অনুষ্ঠান পালন নয়; বরং নিজের চিন্তা, কথা ও কাজে ন্যায়, সততা ও মানবিকতার প্রতিফলন ঘটানো। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, অসহায়ের প্রতি সহমর্মিতা, অন্যের অধিকার রক্ষা এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করার মধ্য দিয়েই ধর্মীয় শিক্ষার প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। শারদীয় দুর্গোৎসব আমাদের সেই নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, দুর্গাপূজার প্রতিটি পর্বের রয়েছে বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনার আবহ তৈরি হয় এবং ভক্তদের মনে দেবী দুর্গার আগমনের প্রত্যাশা জাগে। বোধন, আমন্ত্রণ, অধিবাস, ষষ্ঠী, সপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমীর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবীর আরাধনা করেন। অঞ্জলি, প্রার্থনা, আরতি, পূজা ও ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে ভক্তরা দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন। বিজয়া দশমী বিদায়ের বেদনাকে ধারণ করলেও এর মধ্য দিয়ে ভালোবাসা, ক্ষমা, সৌহার্দ্য ও শুভকামনা বিনিময়ের এক সুন্দর ঐতিহ্য প্রকাশ পায়। এই উৎসব মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে এবং জীবনকে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা জোগায়।
পার্থ কুমার দাস বলেন, বর্তমান সময়ে দুর্গোৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্য উপলব্ধি করার পাশাপাশি এর নৈতিক শিক্ষাকে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ, বৈষম্য, দুর্নীতি, অন্যায় ও অসহিষ্ণুতা দূর করতে হলে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দেবী দুর্গার শক্তি ও সাহসের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ, সত্যের পক্ষে অবস্থান এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। ধর্মীয় উৎসব তখনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে, যখন এর শিক্ষা মানুষের আচরণে, মানবিকতায় এবং সমাজের কল্যাণমূলক কাজে প্রতিফলিত হবে।
তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ঐতিহ্য অটুট রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশ বহু ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মানুষের সম্মিলিত আবাসভূমি। প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা একটি শান্তিপূর্ণ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। দুর্গোৎসবের আনন্দ যেন সকল মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেন পরস্পরের আনন্দ ও অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে। পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, উৎসবের আনন্দ কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উচিত। ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসহায়কে সহযোগিতা করা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা মানবিকতার গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিও তিনি গুরুত্ব দেন।
শুভেচ্ছা বার্তায় তিনি আশা প্রকাশ করেন, শারদীয় দুর্গোৎসব প্রতিটি মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো নিয়ে আসবে। পরিবারে পরিবারে প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি ও ভালোবাসা, সমাজে বৃদ্ধি পাবে সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা এবং দেশ এগিয়ে যাবে উন্নতি, সমৃদ্ধি ও মানবিকতার পথে। মা দুর্গার আশীর্বাদে সকলের জীবন থেকে দুঃখ, দুর্দশা ও অশান্তি দূর হোক এবং সবার মনে জাগ্রত হোক সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের চেতনা—এটাই তাঁর আন্তরিক প্রার্থনা।
পরিশেষে পার্থ কুমার দাস খুলনা ও ফরিদপুর জেলাসহ বাংলাদেশের সকল সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বাঙালিদের শারদীয় দুর্গোৎসবের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তিনি সকলের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বলেন, “মা দুর্গার আগমনে অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, শুভ শক্তির জয় হোক। সত্য, ন্যায়, মানবতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আলোয় আলোকিত হোক আমাদের সমাজ ও দেশ। সবার জীবন আনন্দময় হোক, সবার মঙ্গল হোক।”
শুভ শারদীয়া। জয় মা দুর্গা।
শুভেচ্ছান্তে
পার্থ কুমার দাস