ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শনিবার আটক হয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তার সঙ্গে দলের আরও দুই শীর্ষ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। মূলত যন্তর মন্তরে পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে এই ধরপাকড় চালানো হয়। দিল্লি পুলিশ আইনের ৬৫ নম্বর ধারার অধীনে শহরজুড়ে অন্তত ৬০০ জনকে আটক করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে বিক্ষোভকারীরা রাজধানীতে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে তাদের এই টানাপোড়েন শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত ব্যাপক ধরপাকড়ে রূপ নেয়।
ভুক্তভোগী রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ, সরকার শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ দমানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে বলপ্রয়োগ করছে। গ্রেফতার হওয়ার আগে অভিজিৎ দীপকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের কণ্ঠরোধ করতে নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের পৌঁছাতে বাধা দিতে দিল্লি মেট্রো পরিষেবা বন্ধ রাখা, ট্রেন বাতিল করা এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো কঠোর পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন তারা। ভুক্তভোগীদের দাবি, তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ভয় পেয়েই প্রশাসন সাধারণ মানুষের চলাচলের ওপর এই অঘোষিত কারফিউ জারি করেছে, যা মৌলিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশের ভাষ্যমতে, রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোর স্বার্থেই এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শনিবার ভোর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ব্যারিকেড স্থাপন, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সন্দেহভাজনদের তল্লাশির মাধ্যমে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, জননিরাপত্তা এবং স্থিতি বজায় রাখার জন্য এই বিধিনিষেধ অপরিহার্য। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে যেভাবে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করে তুলছে এবং প্রশাসনের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
এই ধরপাকড় ও বিধিনিষেধের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর স্বাভাবিক জনজীবনে। মেট্রো ও ট্রেন পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা, যারা দৈনন্দিন প্রয়োজনে যাতায়াত করতে গিয়ে পুলিশের তল্লাশির মুখে পড়েছেন। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে এসেছে, যা ডিজিটাল অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় কঠোরতার এই দ্বিমুখী চাপে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, প্রশাসনিক দমন-পীড়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধীদের থামিয়ে দেওয়ার এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে জনমনে ক্ষোভের বারুদ জমাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের যেকোনো বড় ধরণের সামাজিক সংঘাতের কারণ হতে পারে।