জলবায়ু উদ্বাস্তু শিশুদের 'শৈশব' বিক্রি করে “ শহরের বস্তিতে “.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জলবায়ু উদ্বাস্তু শিশুদের 'শৈশব' বিক্রি করে “ শহরের বস্তিতে “..

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
জলবায়ু উদ্বাস্তু শিশুদের 'শৈশব' বিক্রি করে “ শহরের বস্তিতে “..
জলবায়ু উদ্বাস্তু শিশুদের 'শৈশব' বিক্রি করে “ শহরের বস্তিতে “..
ছবি: সংগৃহীত
ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ।..

 

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

সালাউদ্দিন আকবর , কেরানীগঞ্জ , ঢাকা 

১১ বছর বয়সী সিয়ামের দিন শুরু হয় সকাল ৬টায়, ঢাকার কারওয়ান বাজারের পচা সবজি কুড়ানোর মধ্য দিয়ে। আজ থেকে ঠিক সাত মাস আগেও সিয়ামের সকালটা এমন ছিল না। ভোলার চরফ্যাশনের মেঘনা নদীর পাড়ে তার একটা ছোট্ট রঙিন ঘর ছিল, ছিল স্কুলের মাঠ আর বন্ধুদের সাথে নদী চরে ফুটবল খেলার দুরন্ত শৈশব। কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসের এক কালবৈশাখী ঝড়ে মেঘনা নদী গ্রাস করে নেয় তাদের শেষ সম্বলটুকু। রাতারাতি সিয়ামের পরিবার পরিণত হয় 'জলবায়ু উদ্বাস্তু'তে। 

এটি কেবল সিয়ামের একার গল্প নয়। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ। 

ডেটা বক্স: জলবায়ু সংকট ও বিপন্ন শৈশব (এক নজরে পরিসংখ্যান)

  • ঝুঁকিতে থাকা শিশু: ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ (১৯ মিলিয়ন) শিশু।
  • বাস্তুচ্যুতির হার: বিশ্ব ব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের প্রতি ৭ জনের মধ্যে ১ জন বাস্তুচ্যুত হবে, যার একটি বড় অংশই শিশু।
  • কার্বন নিঃসরণের বৈষম্য: বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ০.৪৭% এরও কম, অথচ এর চরম খেসারত দিচ্ছে এ দেশের নিরপরাধ শিশুরা।

এদের মধ্যে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু গ্রামীণ জনপদ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরের অন্ধকার বস্তিগুলোতে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। যেখানে নদী তাদের কেড়ে নিয়েছে ঘর, আর শহর কেড়ে নিচ্ছে তাদের স্বপ্ন ও অধিকার।

১. হারিয়ে যাওয়া শৈশব এবং 'জলবায়ু-প্রেরিত' শিশুশ্রম

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে গ্রামীণ শিশুদের সরাসরি শহরের সস্তা শ্রমিকে রূপান্তর করছে, তার এক নির্মম উদাহরণ ঢাকার হাজারীবাগের চামড়া শিল্প বা টঙ্গীর ভাঙারি দোকানগুলো।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলে (যেমন- সাতক্ষীরা, খুলনা বা ভোলা) লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষিকাজ ও মাছ ধরা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পরিবারগুলো চরম ঋণের মুখে পড়ে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে চলে আসছে। এই পরিবারগুলোর টিকে থাকার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাদের শিশু সন্তানদের কাজে পাঠিয়ে দেওয়া।

আইএলও (ILO)-এর সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, ঢাকা শহরের বস্তিগুলোতে থাকা শিশুশ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৪২% শিশু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রামীণ এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে এসেছে।

সিয়ামের বাবা রহিম মিয়া (৪৫) বলেন, "নদীতে সব শ্যাষ। ঢাকায় আইসা রিকশা চালাইয়া ঘরের ভাড়াই ওডে না। ছোট পোলাডারে কামে না দিলে সবাই না খাইয়া মরুম।"

এখানেই প্রশ্ন ওঠে—যে শিশুরা হতে পারত দেশের ভবিষ্যৎ, জলবায়ুর নির্মম থাবায় তারা আজ অপরিণত বয়সেই উপার্জনের যাঁতাকলে পিষ্ট।

২. অদৃশ্য ক্ষত ও মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা এবং পরিচয় সংকট

আমরা সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বা শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ করি। কিন্তু শিশুদের মনের ওপর যে অদৃশ্য, গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হয় খুব কমই।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের মতে, আকস্মিক দুর্যোগের শিকার হয়ে ঘর-বাড়ি হারানোর পর শিশুদের মধ্যে ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ (PTSD) দেখা দেয়।

  • ভয়ের জগৎ: মেঘনার পাড় থেকে আসা ৯ বছরের সুমি জানায়, ঢাকায় সামান্য বৃষ্টি বা মেঘের ডাক শুনলেও সে আতঙ্কে শিউরে ওঠে—এই বুঝি তার মাথার ওপরের ছাদটি আবার ভেঙে পড়বে।
  • বিচ্ছিন্নতা ও বিষণ্ণতা: গ্রামীণ উন্মুক্ত পরিবেশ থেকে এসে শহরের চার দেয়ালের ঘিঞ্জি, নোংরা বস্তির জীবন এই শিশুদের প্রচণ্ড বিষণ্ণ (Depression) করে তোলে। তারা নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না, যার ফলে তাদের আচরণে উগ্রতা বা চরম অন্তর্মুখিতা প্রকাশ পায়।

৩. শিক্ষাবঞ্চিত প্রজন্ম ও ড্রপ-আউট রেট

ঝড় বা বন্যার পরপরই উপকূলীয় অঞ্চলের স্কুলগুলো সাময়িকভাবে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে বছরের একটা বড় সময় পড়াশোনা বন্ধ থাকে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিটা হয় যখন পরিবারগুলো স্থায়ীভাবে এলাকা ছাড়ে।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এবং স্থানীয় এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জলবায়ুপ্রবণ জেলাগুলোতে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে ওঠার আগেই শিশুদের ড্রপ-আউট (ঝরে পড়ার) হার সাধারণ এলাকার তুলনায় প্রায় ৩৫% বেশি। শহরে আসার পর অর্থাভাব, জন্মনিবন্ধন স্থানান্তরের জটিলতা এবং স্থানীয় স্কুলের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে না পারার কারণে প্রায় ৭০% বাস্তুচ্যুত শিশু আর কখনোই স্কুলের বারান্দায় পা রাখতে পারে না।

৪. মেয়ে শিশুদের দ্বিগুণ ঝুঁকি: বাল্যবিয়ে ও পুষ্টিহীনতা

জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার পরিবারগুলোর সবচেয়ে সহজ ও নিষ্ঠুর শিকার হচ্ছে কন্যাসন্তানেরা। উপকূলীয় অঞ্চলে নোনা জলের কারণে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য যেমন ঝুঁকিতে পড়ছে, তেমনি শহরের বস্তিতে আসার পর নিরাপত্তা ও চরম দারিদ্র্যের অজুহাতে বাড়ছে বাল্যবিয়ে।

সাতক্ষীরার আশাশুনি থেকে আসা ১৪ বছরের মিমির বিয়ে হয়ে যায় ঢাকার এক বস্তিতে, কারণ তার দিনমজুর বাবার পক্ষে বস্তির অরাজক পরিবেশে তরুণী মেয়েকে পাহারা দেওয়া সম্ভব ছিল না। ইউনিসেফের রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাল্যবিয়ের হার সাময়িকভাবে ১৫% থেকে ২০% পর্যন্ত বেড়ে যায়। এছাড়া, প্রোটিন ও সুষম খাদ্যের অভাবে এই শিশুরা মারাত্মক পুষ্টিহীনতার (Malnutrition) শিকার হচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও দুর্বল করে তুলছে।

৫. একটি টেকসই সমাধানের খোঁজে

বাংলাদেশ সরকারের 'মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান' বা 'ডেল্টা প্ল্যান ২১০০'-এ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন নিয়ে অনেক বড় বড় পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিকল্পনাগুলোতে "শিশুকেন্দ্রিক বাজেট ও সুরক্ষা বলয়" এখনো উপেক্ষিত।

আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং পরিবেশবাদীদের মতে, শুধুমাত্র বাঁধ নির্মাণ বা ত্রাণ বিতরণ করে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন:

  • বাস্তুচ্যুত শিশুদের জন্য শহরে বিশেষ 'অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও মানসিক কাউন্সিলিং কেন্দ্র' গড়ে তোলা।
  • জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এমন স্কুল ভবন তৈরি করা যা দুর্যোগের সময়ও শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে পারে।
  • সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এই পরিবারগুলোকে সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া, যেন তারা শিশুকে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে পাঠাতে পারে।

উপসংহার

কারওয়ান বাজারের আবর্জনার স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে সিয়ামের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, সে বড় হয়ে কী হতে চায়? সিয়াম কিছুক্ষণ মলিন মুখে চেয়ে থেকে বলল, "আমি আবার আমার গ্রামের স্কুলে যাইতে চাই। আমার বন্ধুদের সাথে খেলতে চাই।"

সিয়ামের এই চাওয়া কোনো বিলাসী স্বপ্ন নয়, এটি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বীকৃত তার মৌলিক অধিকার। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যে শিশুরা বিন্দুমাত্র দায়ী নয়, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের চরম মূল্য কেন তাদের দিতে হবে? বিশ্বনেতৃত্ব এবং আমাদের নীতিনির্ধারকেরা যদি এখনই শিশুদের এই 'অদৃশ্য কান্না' শুনতে না পান, তবে আমরা কেবল একটি প্রজন্মকেই হারাব না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কাছে হেরে যাবে আমাদের মানবতাও।

 

 

 

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator