জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশন ও বিচারহীনতার সংকট.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশন ও বিচারহীনতার সংকট..

আই নিউজ বিডি সারাদেশ avatar   
আই নিউজ বিডি সারাদেশ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশন ও বিচারহীনতার সংকট..
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশন ও বিচারহীনতার সংকট..
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকায় আয়োজিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এ রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা পুনর্মিলনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক ও বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অপরাধের বিচার এব..

সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর মূল আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা পুনর্মিলনের যৌক্তিকতা ও এর বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ বর্তমানে এক গভীর রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। বক্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কেবল অপরাধের বিচার নয়, বরং সমাজের গভীরে ঢুকে পড়া বিভাজন দূর করতে পুনর্মিলন অপরিহার্য। তবে এই প্রক্রিয়াটি কোনোভাবেই বিচারহীনতার সংস্কৃতির সুযোগ তৈরি করতে পারে না। যৌথ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের অপরাধ স্বীকার ও অনুশোচনার ওপর ভিত্তি করেই কেবল একটি টেকসই রিকনসিলিয়েশন কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। বর্তমান বাস্তবতায় ফ্যাসিবাদের দোসরদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং তাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার অভাব এই প্রক্রিয়াটিকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ভুক্তভোগী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, একটি বিভক্ত জাতি দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাষ্ট্রিক উন্নয়ন ধরে রাখতে পারে না। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ অন্যান্য বিশ্লেষকরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, যারা অতীতে লুটপাট ও অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের মধ্যে এখনো কোনো অনুশোচনা বা ভুল স্বীকারের মানসিকতা নেই। বরং প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের আস্ফালন রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও বিষাক্ত করে তুলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ, কারণ তারা আজ পর্যন্ত তাদের কৃতকর্মের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ সতর্ক করে বলেছেন, যদি প্রতিশোধের এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা না যায়, তবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে। রিকনসিলিয়েশন একটি কঠিন অস্ত্রোপচারের মতো, যা যন্ত্রণাদায়ক হলেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে অপরিহার্য, কিন্তু এর পূর্বশর্ত হলো অপরাধের দায় স্বীকার করা।

সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল স্পষ্ট করেছেন যে, রিকনসিলিয়েশনের আগে ফ্যাসিবাদী শক্তির বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। তার মতে, সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করলে বিশ্বজুড়েই পুনর্মিলন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়েছে, আর বাংলাদেশ সেই পথ অনুসরণ করতে পারে না। অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে রিকনসিলিয়েশনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতির কার্যালয় কিংবা সংসদীয় কাঠামোর মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ তৈরি করা গেলে সরকারের আন্তরিকতা ও দূরদর্শিতার প্রতিফলন ঘটবে। তবে সব পক্ষই একমত যে, অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশন সমান্তরালভাবে চললেও বিচারকে কোনোভাবেই গৌণ করা যাবে না।

পরিশেষে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির চাবিকাঠি নির্ভর করছে এই রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর। যদি বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে অপরাধের দায় স্বীকারের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা না যায়, তবে দেশ বারবার প্রতিশোধের রাজনীতির দুষ্টচক্রে আটকে থাকবে। ২০ কোটি মানুষের প্রত্যাশা ও উন্নয়নের পথে টিকে থাকতে হলে কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে একটি খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। যদি ফ্যাসিবাদী শক্তির অনুশোচনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না যায়, তবে সাময়িক শান্তি এলেও দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সংকট নিরসন হবে অধরা।

没有找到评论


News Card Generator