চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইকো পার্ক এলাকায় গত বুধবার ভোর ৪টার দিকে কাপ্তাই ব্যাটালিয়ন (৪১ বিজিবি) একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সিগারেটের চালান আটক করেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নায়েব সুবেদার মো. আহসান হাবিবের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে ১৭ হাজার ৯০ প্যাকেট প্যাট্রন এবং ১ হাজার ৮০০ প্যাকেট অরিস ব্র্যান্ডের সিগারেট উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৮৩ লাখ ৩ হাজার ৪০০ টাকা। অভিযানে অবৈধ পণ্য পরিবহনের দায়ে একটি ডাম্পার ট্রাক জব্দ করা হয়েছে এবং তৌহিদুল ইসলাম ও সাহেদুর ইসলাম নয়ন নামে দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকা থেকে কাপ্তাই লেক হয়ে সড়কপথে পাচারের সময় বিজিবির কঠোর নজরদারির মুখে এই চালানটি ধরা পড়ে, যা স্থানীয় চোরাচালান চক্রের কৌশলগত রুট ব্যবহারের বিষয়টি পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে।
আটককৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে জানা গেছে, রাঙ্গুনিয়ার নিশ্চিতপুর ও শিলক গ্রামের বাসিন্দা এই দুই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরেই সিন্ডিকেটের সহায়তায় সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে অবৈধ পণ্য দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহের কাজ করে আসছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়কটি দুর্গম ও নির্জন হওয়ায় চোরাকারবারিরা প্রায়শই ডাম্পার বা পণ্যবাহী ট্রাক ব্যবহার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে। উদ্ধারকৃত সিগারেটগুলোর কোনো বৈধ কাগজপত্র বা শুল্ক পরিশোধের প্রমাণ না থাকায় এটি স্পষ্ট যে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেট বাজারজাত করার অপচেষ্টা করছিল। দীর্ঘদিনের এই চোরাচালান প্রক্রিয়ার কারণে স্থানীয় বাজারে যেমন অবৈধ পণ্যের বিস্তার ঘটছে, তেমনি রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জব্দকৃত সিগারেট, ডাম্পার ট্রাক এবং আটক দুই ব্যক্তিকে রাঙ্গুনিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কাপ্তাই ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাওসার মেহেদী জানিয়েছেন, সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে এবং চোরাচালান নির্মূলে নিয়মিত আভিযানিক টহল অব্যাহত থাকবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অপরাধীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, চোরাচালান সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে আরও গভীর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিজিবির এই সাহসী পদক্ষেপকে স্থানীয় সচেতন মহল সাধুবাদ জানালেও, নিয়মিত বিরতিতে এমন চালান ধরা পড়ার বিষয়টি পরিবহন খাতে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছে।
এই অভিযানের সফল সমাপ্তি ঘটলেও রাঙ্গুনিয়া ও কাপ্তাই অঞ্চলের দুর্গম পথগুলো যে চোরাচালানের নিরাপদ করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সীমান্ত থেকে আসা এই অবৈধ পণ্যগুলো মূলত চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি জাতীয় অর্থনীতির জন্য চরম ক্ষতিকর। ভবিষ্যতে এ ধরনের চোরাচালান রোধে কেবল বিজিবির টহলই যথেষ্ট নয়, বরং স্থানীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন। সড়কপথের পাশাপাশি জলপথের রুটগুলোতেও যদি কঠোর নজরদারি বজায় না রাখা হয়, তবে চোরাকারবারিরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে তাদের অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে, যা সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।