বাগেরহাটের মোংলা ও রামপাল উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ১৩১ জন অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীর যাতায়াত বিড়ম্বনা লাঘব এবং বিদ্যালয়মুখী করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। গত মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চত্বরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের হাতে বাইসাইকেল তুলে দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির (সিএসআর) অংশ হিসেবে এই সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তি কমিয়ে তাদের পড়াশোনায় মনোযোগী করে তোলা এবং ঝরে পড়ার হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিবৃন্দ, যারা শিক্ষার্থীদের হাতে এই বাহন তুলে দিয়ে তাদের শিক্ষাজীবনে এগিয়ে চলার প্রেরণা জুগিয়েছেন। মূলত ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে যে সকল শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে হিমশিম খাচ্ছিল, তাদের শিক্ষা কার্যক্রমকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতেই এই আধুনিক ও কার্যকর যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের প্রধান সমস্যা ছিল দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে আসা, যা তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলত এবং প্রায়ই ক্লাসে অনুপস্থিতির কারণ হয়ে দাঁড়াত। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতে, যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে ছিল। বাইসাইকেল প্রাপ্তির ফলে এখন থেকে তারা সময়মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারবে এবং পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যান্য সহ-শিক্ষা কার্যক্রমেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ডেপুটি হেড মোহাম্মদ আলাউদ্দিন অনুষ্ঠানে জানান, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সবসময়ই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুপেয় পানির মতো মৌলিক চাহিদার উন্নয়নেও কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এই সহায়তাকে স্বাগত জানানো হয়েছে, কারণ এটি তাদের যাতায়াতের সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী একাডেমিক সাফল্যের পথ সুগম করবে বলে তারা মনে করছেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না ফেরদৌসী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান এবং এই ধরনের মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মানবসম্পদ কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল আজিম ও ডিজিএম মো. ওজিউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় মানুষের কল্যাণে গৃহীত এই কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তারা উল্লেখ করেন যে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশেপাশের এলাকার মানুষের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, সেলাই মেশিন ও হুইলচেয়ার বিতরণের মতো কর্মসূচিগুলো স্থানীয় অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত এই ধরনের জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগকে স্থানীয় সচেতন মহল ইতিবাচক হিসেবে দেখছে এবং অন্যান্য করপোরেট প্রতিষ্ঠানকেও স্থানীয় উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
এই উদ্যোগটি কেবল শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সমস্যাই সমাধান করছে না, বরং এটি একটি টেকসই শিক্ষা পরিবেশ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নিয়মিত যাতায়াত নিশ্চিত হওয়ার ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের এই মানবিক মডেলটি যদি দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও বাস্তবায়িত হয়, তবে তা গ্রামীণ জনপদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াবে। যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার্থীদের উৎসাহ প্রদানের এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা আগামী দিনে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনশক্তি ও শিক্ষিত প্রজন্ম গঠনে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। পরিশেষে, এই বাইসাইকেল বিতরণ কর্মসূচি কেবল একটি উপহার নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণের পথে এক নতুন গতি সঞ্চারকারী মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।