গত ৪ অক্টোবর ২০২৬ রোজ রবিবার চট্টগ্রামের দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ার তৈয়্যবিয়া রাহাতিয়া আজিজিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা প্রাঙ্গণে পবিত্র ফাতেহা-এ ইয়াজদাহুম এবং এক বিশেষ অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাদরাসার সুপার মাওলানা শাহিদুল আমিন মুরাদ কাদেরীর সভাপতিত্বে এবং পরিচালনা পরিষদের সভাপতি এ বি এম আজম খাঁনের প্রধান আতিথ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবন ও কর্মের আদর্শ শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এবং মাদরাসার শিক্ষার পরিবেশ ও মানোন্নয়ন নিয়ে অভিভাবকদের সাথে সরাসরি মতবিনিময় করা। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও খাতমে গাউছিয়ার মাধ্যমে সূচিত এই আয়োজনে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা শাহাদাত হোসেন এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন শিক্ষক রমজান আলী, যিনি বড়পীর সাহেবের জীবনদর্শন ও ইসলামী শিক্ষায় তাঁর অসামান্য অবদানের ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
অভিভাবক সমাবেশের মূল পর্বে শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার, শৃঙ্খলা এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কেবল পাঠ্যবইয়ের শিক্ষাই যথেষ্ট নয়, বরং শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের সাথে আধুনিক জ্ঞান অর্জনে দক্ষ করে তোলার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকবৃন্দ। সভায় উপস্থিত অভিভাবকরা মাদরাসার অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষার পরিবেশকে আরও যুগোপযোগী করার জন্য বিভিন্ন গঠনমূলক পরামর্শ প্রদান করেন। মাদরাসার পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বিত উদ্যোগই কেবল শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠচর্চা এবং মাদরাসার শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন ভূমিকা রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই মতবিনিময় সভায় উঠে আসে যে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীই ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষায় পারদর্শী হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখে, যা বাস্তবায়নে মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে আরও সুপরিকল্পিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করতে হবে বলে অভিভাবকরা মত প্রকাশ করেন।
মাদরাসার সুপার মাওলানা শাহিদুল আমিন মুরাদ কাদেরী তাঁর বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন যে, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার মাধ্যমেই প্রকৃত মানুষ হওয়া সম্ভব। তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠচর্চা ও সময়ানুবর্তিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর এবং এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা ও অভিভাবকদের সহযোগিতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদরাসার উপদেষ্টা গিয়াস উদ্দিন, ডা. আবু তাহের, কামাল উদ্দিন, কোষাধ্যক্ষ দিদারুল ইসলাম এবং পরিচালনা কমিটির সদস্য এরশাদসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। বক্তারা মাদরাসার সার্বিক উন্নয়নে শিক্ষক, অভিভাবক ও পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মানোন্নয়নে নিয়মিত মনিটরিং এবং অভিভাবকদের সাথে প্রতি মাসে অন্তত একবার মতবিনিময়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
সবশেষে মিলাদ ও কিয়াম শেষে বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর রুহের মাগফিরাত কামনা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনা করা হয়। পরিশেষে উপস্থিত সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অতিথিদের মাঝে তবারুক বিতরণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয়। এই ধরনের ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক সমাবেশ কেবল মাদরাসার পরিবেশকে প্রাণবন্তই করছে না, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় সাধনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ার এই মাদরাসাটি যেভাবে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, তা স্থানীয় শিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা বহন করে। ভবিষ্যতে এই সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা কেবল ধর্মীয় জ্ঞানেই নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আধুনিক শিক্ষায় নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে সক্ষম হবে বলে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন।