নেত্রকোনায় বিলুপ্তপ্রায় বাদ্যযন্ত্র কারিগর সাত্তারের জরাজীর্ণ জীবন: সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় ঐতিহ্যবাহী শিল্প.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নেত্রকোনায় বিলুপ্তপ্রায় বাদ্যযন্ত্র কারিগর সাত্তারের জরাজীর্ণ জীবন: সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় ঐতিহ্যবাহী শিল্প..

Md MR Uzzal avatar   
Md MR Uzzal
নেত্রকোনায় বিলুপ্তপ্রায় বাদ্যযন্ত্র কারিগর সাত্তারের জরাজীর্ণ জীবন: সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় ঐতিহ্যবাহী শিল্প..
নেত্রকোনায় বিলুপ্তপ্রায় বাদ্যযন্ত্র কারিগর সাত্তারের জরাজীর্ণ জীবন: সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় ঐতিহ্যবাহী শিল্প..
ছবি: সংগৃহীত
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় ৪৫ বছর ধরে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ও কারুশিল্প টিকিয়ে রাখা ৭৮ বছর বয়সী কারিগর আ. সাত্তার মানবেতর জীবনযাপন করছেন, যেখানে তার নিজের ঘরটি সংস্কারের সামর্থ্য ও আধুনিক যন্ত্রের অভাব প্রকট।..

নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা ইউনিয়নের চকসাদক কোনাপাড়া গ্রামের ৭৮ বছর বয়সী আ. সাত্তার গত ৪৫ বছর ধরে বাঁশ, কাঠ ও চামড়ার সমন্বয়ে একতারা, দোতারা, খমক ও ঢোলের মতো দেশীয় বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে আসছেন। কেবল বাদ্যযন্ত্রই নয়, গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় পলো, চাঁই ও বাঁশের মই তৈরির মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় কারুশিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই গুণী শিল্পী নিজেই চরম দারিদ্র্যের শিকার। বর্তমানে তিনি মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ জমিতে জরাজীর্ণ একটি ঘরে স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে মানবেতর জীবন অতিবাহিত করছেন। আধুনিক কোনো বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রপাতি না থাকায় বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়ে সাধারণ লোহার খোদাইযন্ত্র দিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত শারীরিক কষ্টের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যা তার সৃজনশীল কাজের গতি ও মানকে বাধাগ্রস্ত করছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই কারুশিল্পের সাথে জড়িত থাকলেও উপকরণের উচ্চমূল্য এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় সাত্তারের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, বাঁশ ও কাঠের দাম বাড়লেও তার তৈরি পণ্যের দাম বাড়েনি, ফলে দীর্ঘ শ্রম দিয়েও তিনি পর্যাপ্ত আয় করতে পারছেন না। তার স্ত্রী আবিয়া খাতুন আক্ষেপ করে জানান, সারাজীবন মানুষটি শিল্পচর্চা করে পার করলেও নিজের একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই পর্যন্ত তৈরি করতে পারেননি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সাত্তার তাদের এলাকার গর্ব এবং তার হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্রের কদর এখনো রয়েছে, কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই শিল্প ও শিল্পী উভয়ই আজ বিলুপ্তির পথে। একজন সহকারী রাখার মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে তিনি এখন কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, যা তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

স্থানীয় এলাকাবাসী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা এই প্রবীণ শিল্পীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারি উদ্যোগে যদি তাকে একটি নিরাপদ ঘর এবং কাজের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক বিদ্যুৎচালিত খোদাইযন্ত্র প্রদান করা হয়, তবে তার শেষ জীবন কিছুটা স্বস্তিতে কাটত। এই দাবির প্রেক্ষিতে কেন্দুয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইউনুস জামান রনি জানিয়েছেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প চলমান রয়েছে এবং খুব শীঘ্রই সাত্তারকে এসব প্রকল্পের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাসের বাস্তবায়নই এখন এই প্রবীণ কারিগরের একমাত্র ভরসা, যা একইসঙ্গে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ঐতিহ্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, আ. সাত্তারের জীবনসংগ্রাম কেবল ব্যক্তিগত অভাবের চিত্র নয়, বরং এটি বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতির এক করুণ প্রতিচ্ছবি। একজন প্রকৃত শিল্পীর জীবনের শেষ সময়ে এসেও মৌলিক চাহিদার অভাব এবং সরকারি সহায়তার দীর্ঘসূত্রতা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি সময়মতো তার হাতে আধুনিক সরঞ্জাম তুলে দেওয়া না হয় এবং ঘরবাড়ি সংস্কারে সহায়তা করা না হয়, তবে কেবল একজন মানুষই নয়, বরং তার সাথে বিলীন হয়ে যাবে গ্রামীণ বাংলার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের এক অমূল্য ধারা। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করাই হতে পারে এই শিল্পীকে তার প্রাপ্য সম্মান ও স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়ার একমাত্র উপায়।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator