গাজীপুরের টঙ্গীর ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের গুটিয়া আন্ধারুল এলাকায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নুর নবীর বাড়ি থেকে ১০টি ককটেল ও আওয়ামী লীগের দুটি ব্যানার উদ্ধার করা হয়েছে। ভোররাতে নুর নবীর বাড়ি থেকে ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেলে স্থানীয়দের সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ওই এলাকায় অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অপরাধীরা পালিয়ে গেলেও বাড়ির ভেতর থেকে বিস্ফোরকদ্রব্য ও রাজনৈতিক ব্যানারগুলো জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে সতর্কতার সাথে ককটেলগুলো নিষ্ক্রিয় করে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই বাড়িটি ব্যবহার করে এলাকায় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছিল, যা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে এবং পুরো এলাকা ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নুর নবী দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। তার সহযোগীদের তালিকায় রয়েছেন হৃদয়, দিপু সরকার, নাহিদ আহমেদ ও মহিন মোল্লার মতো তালিকাভুক্ত অপরাধীরা। স্থানীয়দের দাবি, এরা রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, নুর নবীর বাড়িটি মূলত অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং প্রায়ই সেখান থেকে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যেত। নুর নবীর কর্মকাণ্ডের ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষ সবসময় আতঙ্কে দিনাতিপাত করেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এই চক্রটি রাতের অন্ধকারে বিস্ফোরক মজুত ও মহড়া দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তাদের দাবি, কেবল ককটেল উদ্ধারই যথেষ্ট নয়, বরং এই অপরাধী চক্রের সাথে জড়িত প্রতিটি সদস্যকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নুর নবীসহ তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারে একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, এই অপরাধী চক্রটি পলাতক সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের কাছ থেকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পেত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির লক্ষ্যে এই তহবিল ব্যবহৃত হচ্ছিল। অভিযুক্তদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের বিষয়টি তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, অপরাধী যেই হোক না কেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব কোনোভাবেই তদন্তকে প্রভাবিত করবে না। বর্তমানে বাড়িটি পুলিশের নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এই ঘটনার মাধ্যমে টঙ্গী অঞ্চলে অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক ও তাদের রাজনৈতিক যোগসাজশের বিষয়টি পুনরায় প্রকাশ্যে এসেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা এই কিশোর গ্যাং ও তাদের নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পদ ব্যবহার করে যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনজীবন বিপন্ন করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এই অভিযান যেন কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয়ে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়, সেটিই এখন স্থানীয় সচেতন মহলের মূল দাবি। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, অপরাধী ও তাদের অর্থায়নকারীদের মূলোৎপাটন না করা পর্যন্ত টঙ্গীর জনপদে শান্তি ফিরিয়ে আনা চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।