পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার ১৪৮ নম্বর দক্ষিণ বিন্না কাইলান্তরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত পুষ্টিকর দুধ চুরির ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের আড়ালে ছাত্রদল নেতা মো. নাদিম মাহমুদ ও তার সহযোগীরা বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ঢুকে শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ৭৯ প্যাকেট দুধের মধ্য থেকে ৩০ প্যাকেট নিয়ে যান। ঘটনার সময় বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত ছিলেন, এই সুযোগটিকেই ব্যবহার করেছেন অভিযুক্তরা। বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে জানাজানি হওয়ার পর এবং গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের প্রেক্ষিতে পিরোজপুর জেলা ছাত্রদল নড়েচড়ে বসে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গত ১ অক্টোবর রাতে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সালাউদ্দিন তালুকদার কুমার ও সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান শাহীন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নাদিম মাহমুদকে সংগঠনের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল সাংগঠনিক পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। নাদিম মাহমুদ বলদিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক এবং সরকারি স্বরূপকাঠী কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
ভুক্তভোগী বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, দুধ চুরির ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। কোমলমতি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারের এই বিশেষ উদ্যোগকে তুচ্ছ করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দুধ নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। চুরির বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর চাপের মুখে বুধবার সকালে অভিযুক্ত নাদিম ও তার সহযোগীরা বিদ্যালয়ে গিয়ে ২৭ প্যাকেট দুধ ফেরত দিয়ে আসেন। তবে অবশিষ্ট তিন প্যাকেট দুধ তারা নিজেরা খেয়ে ফেলেছেন বলে স্বীকার করেন, যা শিশুদের অধিকারের প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে শিশুদের খাবার নিয়ে যাওয়ার এই ধৃষ্টতা স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের কাছে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভুক্তভোগী বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিতকরণ কর্মসূচির ওপর বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষিতে জেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ছাত্রদল একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন এবং কোনো নেতাকর্মীর ব্যক্তিগত অপরাধের দায় সংগঠন নেবে না। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সালাউদ্দিন তালুকদার কুমার স্পষ্ট করেছেন যে, সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী কাউকে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন বহিষ্কৃত নাদিম মাহমুদের সঙ্গে কোনো ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সম্পদ রক্ষায় ম্যানেজিং কমিটি ও শিক্ষকদের আরও সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। সরকারি সম্পদ তছরুপের এই ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
এই ঘটনাটি কেবল একটি চুরির ঘটনা নয়, বরং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি সম্পদ দখলের একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত। কোমলমতি শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত পুষ্টির খাবার নিয়ে টানাহেঁচড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মীদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনিক কঠোরতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের জন্য চলমান জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হবে। এই বহিষ্কারাদেশটি কেবল একটি সাংগঠনিক পদক্ষেপ হিসেবে না দেখে, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মীদের নৈতিক অবক্ষয় রোধে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত।