মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার চাটুরা এলাকায় গত মঙ্গলবার বিকেলে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় সিএনজি অটোরিকশার চালক সুধাময় দেব নিহত হয়েছেন। বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে দ্রুতগতির একটি প্রাইভেটকার ও বিপরীত দিক থেকে আসা সিএনজি অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই প্রকট ছিল যে, উভয় যানবাহন দুমড়েমুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই চালক ও যাত্রীরা গুরুতর জখম হন। স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ প্রশাসনকে খবর দিলে তারা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। রাজনগর থানার উপপরিদর্শক অরুপ সরকার জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেটকারের চালক ফাইজা আক্তার এবং সিএনজি যাত্রী শ্রীমন্ত দেবকেও গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই আহতদের মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়, যেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা সুধাময় দেবকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত সুধাময় দেব উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের ভূমিউড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বর্তমানে আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রাইভেটকারের গতি বা চালকের অসাবধানতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের বর্ণনায় উঠে এসেছে যে, চাটুরা এলাকার রাস্তাটি বেশ সরু এবং সেখানে প্রায়শই চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাইভেটকার ও সিএনজি চালকরা যত্রতত্র ওভারটেকিং করার প্রবণতা দেখান, যার ফলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। আহতদের পরিবারের সদস্যদের দাবি, দ্রুতগতির প্রাইভেটকারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অটোরিকশাটিকে সজোরে ধাক্কা দিলে হতাহতের এই ঘটনা ঘটে। একজন স্থানীয় বাসিন্দার ভাষ্যমতে, ঘটনার সময় রাস্তায় যানবাহনের চাপ ছিল মাঝারি, কিন্তু চালকদের অদক্ষতা এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা এখানে মূল সংকট হিসেবে কাজ করেছে। সিএনজি চালক সুধাময় দেবের মৃত্যুতে তার পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয়রা এই রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী যানবাহনের ওপর কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার এবং তাদের দ্রুত সুস্থতা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ বিরাজ করছে। মূলত, সড়কের সংকীর্ণতা এবং চালকদের প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চালানোর মানসিকতাই এই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। রাজনগর থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দুর্ঘটনার পর জব্দ করা যানবাহন দুটি পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত ট্রাফিক চেকিং বা গতিসীমা নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ওই এলাকায় দেখা যায় না, যা চালকদের বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ করে দেয়। সংশ্লিষ্ট বাস মালিক সমিতি বা পরিবহন সংশ্লিষ্ট সংগঠনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া না গেলেও, স্থানীয় প্রশাসন দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রচারণা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শুধুমাত্র দায়সারা তদন্তের মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। তাই এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই দুর্ঘটনাটি রাজনগর উপজেলার পরিবহন খাতের অনিয়ম ও নিরাপত্তার অভাবকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতি বছর সড়কে ঝরছে অসংখ্য প্রাণ, যার পেছনে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে চালকদের অদক্ষতা ও ট্রাফিক আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা। সুধাময় দেবের অকাল মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই ভেঙে দেয়নি, বরং এটি স্থানীয় সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার নিরাপত্তাহীনতাকেও ফুটিয়ে তুলেছে। যদি এ ধরনের দুর্ঘটনারোধে প্রশাসন কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং চালকদের লাইসেন্স ও দক্ষতার ওপর নজরদারি না বাড়ায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে জননিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়বে। সড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং প্রতিটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা এখন সময়ের দাবি।