সোমবার সকালে খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলনকক্ষে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এবং এর সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও প্রবিধানমালা বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আয়োজনে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার মো: আবদুল্লাহ হারুন, যিনি তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতকরণে আইনটির গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে তথ্য প্রদানে বিদ্যমান ভীতি দূর করার আহ্বান জানান। সেমিনারে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (শিক্ষা ও আইসিটি) সিফাত মেহনাজ এবং অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) আবু সায়েদ মো: মনজুর আলমও আলোচক হিসেবে অংশ নেন। খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিসের উপপ্রধান তথ্য অফিসার (রুটিন দায়িত্ব) মো: মেহেদী হাসান কীনোট পেপার উপস্থাপন করেন, যেখানে আইনটির বিভিন্ন দিক এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা বিশদভাবে আলোচিত হয়। এতে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন, যা আইনটির প্রয়োগ সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং সমাধানের পথ নিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
সেমিনারে বিভাগীয় কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, সঠিক তথ্য প্রাপ্তি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হলেও, অনেক সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে তথ্য প্রদানে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। এই ভীতি মূলত জবাবদিহিতার অভাব, প্রক্রিয়াগত জটিলতা অথবা তথ্যের ভুল ব্যাখ্যার আশঙ্কায় প্রোথিত। যখন কর্মকর্তারা নিজেদের কর্মপরিধিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হন, তখন তথ্য প্রকাশে তাদের অনীহা আরও প্রকট হয়, যা আইনটির মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ২০০৯ সালে এই আইন প্রণীত হলেও, এর প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। নাগরিকরা প্রায়শই সময়মতো তথ্য পেতে ব্যর্থ হন অথবা অসম্পূর্ণ তথ্য পান, যা সরকারি সেবার মান এবং জবাবদিহিতা উভয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করে, তেমনি সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সেমিনারে এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার এবং এর মূল কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করার উপর জোর দেওয়া হয়, যা আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য।
আলোচনায় উঠে আসে যে, তথ্য অধিকার আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সকল সরকারি কর্মকর্তার স্বপ্রণোদিত হয়ে তথ্য প্রকাশে এগিয়ে আসা উচিত। বিভাগীয় কমিশনারের এই আহ্বান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কেবল অনুরোধের ভিত্তিতে তথ্য প্রদানের অপেক্ষায় না থেকে কর্তৃপক্ষের উচিত নিজস্ব উদ্যোগে জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা। তবে, এই স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোগত সহায়তা এবং একটি সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে, কর্মকর্তারা আইন সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন অথবা তথ্য প্রকাশের পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন না। ফলে, তাদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা ও অনীহা কাজ করে। এই সেমিনার সেই ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে, যদি এর আলোচনাগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তরিত হয়। আইনটির কার্যকর প্রয়োগের জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ত্রুটিপূর্ণ তথ্য প্রদানে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং সফল তথ্য প্রদানকারীদের উৎসাহিত করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক।
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর কার্যকর বাস্তবায়ন কেবল সরকারি দপ্তরের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করে না, বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। খুলনাতে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারটি যদিও আইনটির গুরুত্ব এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো নতুন করে তুলে ধরেছে, তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আলোচনা থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলোকে বাস্তবে রূপায়ণের ওপর। যদি কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদ্যমান ভীতি দূর করা না যায় এবং স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে আইনটি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, যা শেষ পর্যন্ত সুশাসন ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। এই সমস্যার সমাধান না হলে ভবিষ্যতে সরকারি কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণ কমে যাবে এবং আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলবে।