চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এক বিশাল চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম দুই মাস অর্থাৎ জুলাই ও আগস্ট সময়ে সরকার মোট ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার সমতুল্য। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ৭১ লাখ ১০ হাজার ডলার বা ৮ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। পরিসংখ্যানটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায়ভার ৩ কোটি ১৮ লাখ ১০ হাজার ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতির পেছনে মূলত ঋণের আসল ও সুদের কিস্তি যথাসময়ে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা কাজ করছে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
ইআরডির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিশোধিত ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলারের মধ্যে মূল ঋণের কিস্তি বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৫১ কোটি ৬০ লাখ ৪০ হাজার ডলার বা ৬ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। বাকি ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার বা ২ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধের খাতে। এই বিশাল অংকের অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে বাড়তি চাপ পড়ছে, তা স্পষ্ট। ঋণগ্রহীতা হিসেবে আন্তর্জাতিক শর্তাবলী মানতে গিয়ে সরকার নিয়মিত কিস্তি পরিশোধে বাধ্য হলেও, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ব্যয় সংকোচন বা বিকল্প আয়ের উৎস সন্ধানে ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির এই সময়ে সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ছে বলে ভুক্তভোগী মহল এবং বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে উঠে আসছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং নীতিনির্ধারকদের ভাষ্যমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের সুদহার এবং বিনিময় হারের অস্থিরতা এই বাড়তি ব্যয়ের অন্যতম কারণ। যদিও সরকার নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ঋণযোগ্যতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে, তবে নতুন ঋণের প্রবাহ এবং অর্থছাড়ের হার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মাত্র ২৯ কোটি ৪৫ লাখ ৬০ হাজার ডলারের ঋণ সহায়তা পাওয়া গেছে এবং নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ২৪ কোটি ডলারের, যা গত বছরের ২৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের চেয়েও কম। এমন পরিস্থিতিতে ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের বিপরীতে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমে আসা একটি অশনি সংকেত। প্রশাসনিক পর্যায়ে নজরদারি বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়িয়ে বৈদেশিক সহায়তার অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের দাবি জোরালো হচ্ছে, যাতে করে ঋণের বোঝা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।
পরিশেষে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদি ঋণের বিপরীতে নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ বা সহজ শর্তে ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত, নিত্যপণ্যের দাম এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে সরকারকে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, ক্রমবর্ধমান এই ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ দেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে।