গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক হামলার ঘটনায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মারাত্মকভাবে আহত হন এবং তাঁকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়। ইরানের অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস-এর সদস্য মোহসেন হেয়দারির ভাষ্যমতে, তেহরানের তিনটি পৃথক চিকিৎসা কেন্দ্রে ধারাবাহিক বোমা হামলার সময় মোজতবা খামেনি তৃতীয় হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবন ও কার্যালয় চত্বর, যেখানে ওই হামলায় ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতাসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এই ঘটনার পর থেকেই মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে অনুপস্থিত রয়েছেন, যা ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এক গভীর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের জন্ম দিয়েছে। উদ্ধার অভিযানের পর তাঁর শারীরিক অবস্থা এবং বর্তমান অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মোহসেন হেয়দারির দাবি অনুযায়ী, হামলার পরবর্তী সময়ে মোজতবা খামেনিকে নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য গোপন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেখানে তিনি ৮ মার্চ ৫৯টি ভোটের মধ্যে ৫০টি ভোট পেয়ে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন। যদিও এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত গোপনীয় এবং অংশগ্রহণকারী সদস্যদেরও বৈঠকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগেভাগে জানানো হয়নি। হেয়দারির মতে, মোজতবা খামেনি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর এই দায়িত্ব গ্রহণ করা আইনি ও ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক ছিল। তবে এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার বৈধতা এবং তৎকালীন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সদস্যদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগগুলো নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস দাবি করছে যে মোজতবা সুস্থ এবং দেশ পরিচালনার সক্ষমতা রাখেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহল এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাঁর শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এই সংকটের বিপরীতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করেছেন। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সময় ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান দাবি করেন যে, এক মাস আগে মোজতবা খামেনির সঙ্গে তাঁর সাত ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠক হয়েছে এবং তিনি তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় দেখেছেন। তবে এই দাবির বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ট্রাম্পের দাবি, হামলায় মোজতবার শরীরের বাম পাশ, হাত ও পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা তাঁকে নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে অক্ষম করে তুলতে পারে। এই দুই বিপরীতমুখী তথ্যের কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়েছে, যা দেশটির প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
মোজতবা খামেনির দীর্ঘ অনুপস্থিতি এবং তাঁর স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিয়ে সরকারি ভাষ্যের অসংলগ্নতা ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। একজন নেপথ্যের মানুষ হিসেবে পরিচিত মোজতবা কখনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পদে না থাকায়, তাঁর ওপর অর্পিত এই নতুন দায়িত্ব কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে খোদ ইরান সরকারের ভেতরেই মতভেদ স্পষ্ট। হামলার পর থেকে সামরিক ও রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণী মহলে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তার সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। যদি নেতৃত্বের এই অস্পষ্টতা অব্যাহত থাকে, তবে আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার দিকে ধাবিত হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সমগ্র পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তায়।