মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: উন্নয়নের পথে বড় বাধা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: উন্নয়নের পথে বড় বাধা

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: উন্নয়নের পথে বড় বাধা
মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: উন্নয়নের পথে বড় বাধা
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণবন্ত ধারাকে সচল রাখতে এবং ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে মেগা প্রকল্পগুলো এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ.....

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণবন্ত ধারাকে সচল রাখতে এবং ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে মেগা প্রকল্পগুলো এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ অসংখ্য বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প দেশের চেহারা বদলে দিচ্ছে। কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আড়ালে লুকিয়ে আছে দুর্নীতির এক কালো ছায়া, যা প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও সরকারি নিরীক্ষায় এই খাতের ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে, যা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দুর্নীতির নজিরবিহীন ঘটনা দেশবাসীকে স্তম্ভিত করেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রকল্পে একটি বালিশ প্রায় ৯০ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে, যেখানে ৪,৭০২টি বালিশ কিনতে সরকারের ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। শুধু বালিশ নয়, আবাসন এলাকা 'গ্রিন সিটি'-র ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনাতেও সরকারি দরের চেয়ে আট গুণ বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। ২৭ কোটি টাকার যন্ত্রপাতির জন্য ২১৪ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যার ফলে অতিরিক্ত ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা গচ্চা গেছে। এছাড়া, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পেও দুর্নীতির পাহাড় জমেছে। ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মাদারীপুরের সাবেক দুই জেলা প্রশাসকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যিনি বর্তমানে রেলের মহাপরিচালক (ডিজি) পদে বহাল আছেন। অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে প্রায় ২২৫ থেকে ২২৮ কোটি টাকা, যা একই সময়ে নির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের (৪৪.৭১ কোটি টাকা/কিমি) তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি। এমনকি ফরিদপুরের ভাঙ্গা রেলস্টেশন যেখানে ৫ কোটি টাকায় নির্মাণ সম্ভব ছিল, সেখানে ১৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে।

সড়ক ও সেতু নির্মাণ খাতেও দুর্নীতির চিত্র ভয়াবহ। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ এবং টাঙ্গাইলের বাসাইলে সেতু নির্মাণে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তিন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। টাঙ্গাইলের ১০ কোটি টাকার সেতুতে দুদকের অভিযানেও রডের পরিমাণ কম পাওয়া গেছে, যা প্রাথমিক দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়। এলজিইডির ৩৬টি অফিসে একযোগে অভিযান চালিয়েছে দুদক, যেখানে নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, কাজ শেষ না করেই বিল উত্তোলন এবং ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পেও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য অধিগ্রহণকৃত ৪০ একর জমির একাংশে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় সাবেক সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং ১৩ জন সাবেক সচিবসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন এই প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়নে বিলম্বের পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দুর্নীতির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। একটি টাস্কফোর্স প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, যমুনা রেল সেতু, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, বঙ্গবন্ধু টানেল, ঢাকা এমআরটি লাইন ৬, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) লাইন-৩ সহ আটটি মেগা প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলিত বাজেটের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বা ৭.৫২ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। দুর্বল সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ভুল সিদ্ধান্তকে ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ এবং সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশই দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে অপচয় হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৪ বছরে সড়ক ও সেতু খাতে ২৯ হাজার থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। টেন্ডার সিন্ডিকেট এই খাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেছেন, দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টেন্ডার সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও মেগা প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়েছে এবং প্রতিবেদন হাতে পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন।

এই ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জনগণের করের টাকা অপচয় হচ্ছে, প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। যখন একটি দেশের মেগা প্রকল্পগুলো দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারায় এবং টেকসই উন্নয়নের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। জবাবদিহিতার অভাবে অপরাধীরা প্রায়শই পার পেয়ে যায়, যা দুর্নীতির চক্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

সুপারিশ: মেগা প্রকল্প, সড়ক, সেতু ও টেন্ডার সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি দমনে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী কমিশন গঠন করা জরুরি, যা প্রভাবমুক্তভাবে সকল অভিযোগ তদন্ত করবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও নিরীক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ই-জিপি (e-GP) প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও ত্রুটিমুক্ত করতে হবে যাতে টেন্ডার সিন্ডিকেট সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দেওয়া যায়। সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে এবং গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দ্রুত অপসারণ ও তাদের অর্জিত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: ইমরান খান

ইমরান খান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: মেগা প্রজেক্ট, সড়ক, সেতু ও টেন্ডার সিন্ডিকেট।

コメントがありません


News Card Generator