রাজউক, সিডিএ ও নগর উন্নয়নে দুর্নীতির জাল: তদন্ত ও প্রতিকারের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

রাজউক, সিডিএ ও নগর উন্নয়নে দুর্নীতির জাল: তদন্ত ও প্রতিকারের চ্যালেঞ্জ

তাসনিম হক  avatar   
তাসনিম হক
রাজউক, সিডিএ ও নগর উন্নয়নে দুর্নীতির জাল: তদন্ত ও প্রতিকারের চ্যালেঞ্জ
রাজউক, সিডিএ ও নগর উন্নয়নে দুর্নীতির জাল: তদন্ত ও প্রতিকারের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল নগরীগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়ন ও জনসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সি...

বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল নগরীগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়ন ও জনসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং সংশ্লিষ্ট নগর উন্নয়ন সংস্থাগুলো দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতগুলোতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং উচ্চ আদালতের সক্রিয়তা চোখে পড়লেও, দুর্নীতির গভীর শিকড় উপড়ে ফেলা এখনো এক বড় চ্যালেঞ্জ। প্লট বরাদ্দ থেকে শুরু করে ভবন নির্মাণ অনুমোদন, এমনকি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ পর্যন্ত বিস্তৃত এই অনিয়মগুলো নগরবাসীর জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।

রাজউকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জন অন্যতম। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাইকোর্ট রাজউকের 'কোটিপতি কর্মচারীদের' অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তে দুদক ও রাজউককে নির্দেশ দেন। এই কর্মচারীদের অনেকেই তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির হলেও তাদের রাজধানীতে একাধিক বহুতল বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট ও দোকানপাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। একই বছরের মার্চ মাসে, 'রাতারাতি ঘুরে যায় ভাগ্যের চাকা, কোটিপতি বানানোর কারখানা রাজউক' শিরোনামে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনের পর হাইকোর্ট আবারও দুদককে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেন। এছাড়া, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পূর্বাচল কনভেনশন লিমিটেডে প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও ৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। ২০২৪ সালের নভেম্বরে, রাজউক কর্তৃপক্ষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপ নেয়, যেখানে ৬ জন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, ২৩ জন কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে এবং ৪ জন প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। সর্বশেষ, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দুদক রাজউকে অভিযান চালিয়ে ইমারত নির্মাণে ঘুষ ও দুর্নীতির সত্যতা পেয়েছে বলে জানা যায়। তবে, ২০২৫ সালের মে মাসে রাজউকের আলোচিত ১৫টি প্লট বরাদ্দের অভিযোগের ক্ষেত্রে দুদক কোনো অনিয়ম খুঁজে না পাওয়ায় অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিসমাপ্ত করে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে সরকারি প্লট বরাদ্দে অনিয়মের দুটি মামলার রায়ে দুদকের আইনজীবীরা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেন। এসব ঘটনা রাজউকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-এর চিত্রও ভিন্ন নয়। বিগত ১৫ বছরে সিডিএর প্রায় ১৫টি মেগা প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি কাজ শুরু করে। এই কমিটি দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। সিডিএর বাস্তবায়ন করা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও আউটার রিং রোড প্রকল্পে 'কিছু অনিয়ম তো আছে' বলে খোদ সংস্থাটির সচিব রবীন্দ্র চাকমা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুদক কর্মকর্তাদের কাছে স্বীকার করেন। আউটার রিং রোড প্রকল্পটি চারবার সংশোধনের পর ৮৫৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩,৩২৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে সিডিএর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বেতন গ্রহণ এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তবে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে জানা যায় যে, সিডিএর বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির দুই মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি, যা জনমনে হতাশা ও সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, একটি ভবনের নকশা অনুমোদনের পরও ঘুষের দাবিতে অনুমোদনপত্র আটকে রাখার অভিযোগে সিডিএ কার্যালয়ে দুদক অভিযান চালায় এবং প্রাথমিক তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পায়। এছাড়া, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সিডিএর প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে, যেখানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় বলে উল্লেখ করা হয় এবং দুদক প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাউকেই আইনের আওতায় আনতে পারেনি বলে অভিযোগ করা হয়।

নগর উন্নয়নের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে কাঠামোগত দুর্বলতা এবং পরিকল্পনার অভাবও প্রকট। ২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত এক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরের মতো বৃহত্তম শহরেও নগর-পরিকল্পনা কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেটের ৫০ শতাংশের কম বরাদ্দ রয়েছে, যা বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ বন্ধ বা বিলম্বিত করছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার শহর উন্নয়নের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করলেও, দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোর চাহিদা মেটাতে তা অপ্রতুল। এছাড়া, বাংলাদেশে নগর-পরিকল্পনাকারীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম, এবং ২০২৩ সালে নগর-পরিকল্পনা বিভাগের ৩৫ শতাংশ পেশাজীবীরই যথাযথ প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা ছিল না। অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাবদ্ধতা, যানজট, বায়ুদূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ প্রধান শহরগুলোতে প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতির পাহাড় ভেঙে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য ও বদলি বাণিজ্যকে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ চুরির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আশার কথা হলো, ভূমি জালিয়াতি রোধে ২০২৩ সালে 'ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন' প্রণীত হয়েছে, যেখানে জালিয়াতির জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। রাজউকও তাদের কার্যক্রমকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যা অনিয়ম ও জনভোগান্তি কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই সমস্ত তথ্য প্রমাণ করে যে, রাজউক, সিডিএ এবং নগর উন্নয়ন খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম একটি গভীর সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। যদিও তদন্ত ও কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তবে এর গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, প্লট জালিয়াতি, নকশা অনুমোদনে ঘুষ গ্রহণ ইত্যাদি ঘটনাগুলো নগরবাসীর আস্থা ক্ষুণ্ণ করছে এবং টেকসই নগর উন্নয়নে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

সুপারিশ: রাজউক, সিডিএ এবং অন্যান্য নগর উন্নয়ন সংস্থাগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করা উচিত, যেখানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সকল উন্নয়ন প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে এবং নিয়মিত অডিট রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। ভূমি সংক্রান্ত সকল সেবাকে সম্পূর্ণরূপে ডিজিটালাইজড করে মানুষের সাথে কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে আনতে হবে, যাতে ঘুষ ও হয়রানির সুযোগ কমে আসে। 'ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩' এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং ভূমি জালিয়াতির সাথে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নগর পরিকল্পনাবিদদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তাদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে পরিকল্পিত নগরায়ন সম্ভব হয়। এছাড়া, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটিগুলোর কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত, এবং তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: তাসনিম হক

তাসনিম হক, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: রাজউক, সিডিএ ও নগর উন্নয়ন।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator