অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি

অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে গঠিত বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (BIMSTEC) এর ষষ্ঠ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক এবং এর পরবর্তীতে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বর্ধিত আগ্রহ দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। যেখানে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক (SAARC) গত কয়েক বছর ধরে কার্যত স্থবির হয়ে আছে, সেখানে বিমসটেক তার গতিশীলতা প্রমাণ করে চলেছে। এই পরিস্থিতি শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে না, বরং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগও এই অঞ্চলের দিকে আকর্ষণ করছে। বিশেষত বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায়, এই অঞ্চলের দেশগুলো তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সমূহের মাধ্যমে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের দিকে ঝুঁকছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

সার্কের নিষ্ক্রিয়তা মূলত ভারত-পাকিস্তান দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বৈরীতার ফল। ২০১৬ সালে উরি হামলার পর সার্ক শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত হওয়ার পর থেকে সংস্থাটি কার্যত অচল। এই শূন্যতা পূরণে বিমসটেক একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, বিশেষ করে ভারতের 'লুক ইস্ট' এবং পরবর্তীতে 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির কারণে। বিমসটেক বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় দেশগুলোকে একত্রিত করে সমুদ্রপথে বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, পর্যটন এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় হাইওয়ে এবং কালদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের মতো উদ্যোগগুলো এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি করছে। এই উদ্যোগগুলো শুধুমাত্র বাণিজ্য বৃদ্ধি করছে না, বরং সাংস্কৃতিক বিনিময় ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় করতেও সাহায্য করছে, যা সার্কের প্রাথমিক লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে তা অর্জিত হতে পারেনি। এই নতুন গতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যে নয়, বরং বৃহত্তর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথেও সংযোগ স্থাপনে উৎসাহিত করছে, যা ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত পরিবর্তন।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব অনস্বীকার্য। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এই অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে বিশাল বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে, বিশেষ করে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে। এই বিনিয়োগগুলো একদিকে যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অন্যদিকে কিছু দেশের উপর ঋণের বোঝা এবং কৌশলগত নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে, যেমন ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (IPS)। এই কৌশলগত প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মধ্যে ফেলেছে, যেখানে তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে, প্রত্যেক দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তাদের বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করতে হচ্ছে, যাতে তারা কোনো একক পরাশক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে পারে। এই ভারসাম্য রক্ষা করা শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য, কারণ যেকোনো একটি ভুল পদক্ষেপ এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করতে পারে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সংঘাত নিরসনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভূমিকা, বিশেষত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে (UN Peacekeeping) তাদের অবদান, ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপাল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই দেশগুলো বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখার পাশাপাশি নিজেদের সামরিক বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনাম অর্জন করছে। তবে, এই অঞ্চলে এখনও আন্তঃরাষ্ট্রীয় এবং আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সমুদ্র নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সার্ক বা বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সমুদ্রপথে চোরাচালান ও জলদস্যুতা দমনে বিমসটেক দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত নৌমহড়া এবং তথ্য আদান-প্রদান অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় যৌথ কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়া। এই কৌশলগত সহযোগিতা শুধুমাত্র আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করবে এবং একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গঠনে সহায়ক হবে।

সূচক সার্ক (SAARC) বিমসটেক (BIMSTEC) জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান (মার্চ ২০২৪)
প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৮৫ ১৯৯৭ (প্রযোজ্য নয়)
সদস্য দেশ ৮ ৭ (প্রযোজ্য নয়)
শেষ শীর্ষ সম্মেলন ২০১৬ (স্থগিত) ২০২২ (৫ম) (প্রযোজ্য নয়)
আঞ্চলিক বাণিজ্য (% মোট বাণিজ্য) ~৫% ~৭% (ক্রমবর্ধমান) (প্রযোজ্য নয়)
উল্লেখযোগ্য অবকাঠামো প্রকল্প সীমিত উল্লেখযোগ্য (যেমন, কালদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট) (প্রযোজ্য নয়)
শীর্ষ ৫ দক্ষিণ এশীয় শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ (প্রযোজ্য নয়) (প্রযোজ্য নয়) বাংলাদেশ: ৬,১৯৭ জন
নেপাল: ৬,২৭৯ জন
ভারত: ৬,০৯৭ জন
পাকিস্তান: ৪,১৭১ জন
শ্রীলঙ্কা: ৬০০ জন

উৎস: সার্ক সচিবালয়, বিমসটেক সচিবালয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) এর মার্চ ২০২৪ সালের তথ্য এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • সার্কের স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সমূহের পক্ষ থেকে একটি 'SAARC Economic Revival Initiative' প্রস্তাব করা উচিত, যেখানে বিতর্কিত রাজনৈতিক বিষয়গুলো আপাতত স্থগিত রেখে শুধুমাত্র বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সংযোগ বৃদ্ধির উপর ফোকাস করা হবে। এই প্রস্তাবনার আওতায় একটি 'সার্ক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি পুনর্গঠন কমিটি' গঠন করে নতুন করে বাণিজ্য চুক্তিগুলোর খসড়া প্রস্তুত করা যেতে পারে, যা সদস্য দেশগুলোর জাতীয় স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
  • BIMSTEC কে আরও শক্তিশালী করার জন্য সদস্য দেশগুলোকে 'BIMSTEC Master Plan for Transport Connectivity' এর দ্রুত বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'BIMSTEC অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে। এই তহবিল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর সাথে যৌথ অংশীদারিত্বে পরিচালিত হতে পারে, যা আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পগুলোর অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনবে।
  • দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সমূহের উদ্যোগে একটি 'দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপ ফোরাম' প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এই ফোরামের প্রধান কাজ হবে অ-ঐতিহ্যবাহী নিরাপত্তা হুমকি যেমন সাইবার নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ এবং আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যৌথ কৌশল প্রণয়ন ও UN Peacekeeping এর কার্যক্রমের সাথে সমন্বয় সাধন করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator