ওষুধ গবেষণায় বাংলাদেশ: মেধাশূন্যতা নাকি অর্থায়নের সংকট? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ওষুধ গবেষণায় বাংলাদেশ: মেধাশূন্যতা নাকি অর্থায়নের সংকট?

ড. সাবরিনা ইয়াসমিন  avatar   
ড. সাবরিনা ইয়াসমিন
ওষুধ গবেষণায় বাংলাদেশ: মেধাশূন্যতা নাকি অর্থায়নের সংকট?
ওষুধ গবেষণায় বাংলাদেশ: মেধাশূন্যতা নাকি অর্থায়নের সংকট?
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প, যা একসময় আমদানিনির্ভর ছিল, আজ দেশের ৯৭ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে এবং প্রায় ১৫০টি দেশে রপ্তানি হয়। এই সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে,...

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প, যা একসময় আমদানিনির্ভর ছিল, আজ দেশের ৯৭ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে এবং প্রায় ১৫০টি দেশে রপ্তানি হয়। এই সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে, এই চিত্রের আড়ালে একটি গভীরতর সংকট লুকিয়ে আছে, যা সম্প্রতি 'স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়' কর্তৃক আয়োজিত একটি জাতীয় সংলাপে স্পষ্ট হয়েছে। সংলাপে দেশীয় কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হলেও, মৌলিক ওষুধ আবিষ্কার এবং বায়োটেকনোলজি গবেষণায় বাংলাদেশের প্রায় অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। যেখানে পার্শ্ববর্তী ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো নতুন নতুন ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবনে বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে, সেখানে বাংলাদেশ মূলত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই পরিস্থিতি প্রশ্ন তোলে: বাংলাদেশের ওষুধ গবেষণার ভবিষ্যৎ কি মেধাশূন্যতা নাকি অর্থায়নের সংকট, নাকি উভয়ই এর জন্য দায়ী?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই অর্থায়নের দিকটি খতিয়ে দেখতে হয়। বিশ্বব্যাংকের (World Bank) সাম্প্রতিক 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত অপ্রতুল। স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের মাত্র ০.১ শতাংশেরও কম গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করা হয়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক সুপারিশকৃত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২% এর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে। এই নগণ্য বরাদ্দ দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন, উচ্চমানের যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং গবেষকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদানে অক্ষম করে তোলে। বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলো, যদিও তারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য বাজারজাতকরণ এবং প্রচলিত জেনেরিক ওষুধের উৎপাদন। নতুন ওষুধ আবিষ্কারের উচ্চ ঝুঁকি, দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং অনিশ্চিত সাফল্যের কারণে তারা মৌলিক গবেষণায় বিনিয়োগ করতে অনাগ্রহী। ফলস্বরূপ, নতুন আণবিক সত্তা (New Chemical Entity - NCE) বা বায়োলজিক্যাল ওষুধ আবিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা বাস্তুতন্ত্র (ecosystem) বাংলাদেশে বিকশিত হতে পারছে না, যা উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করছে।

অর্থায়নের এই সংকট মেধাবী গবেষকদেরও দেশ ত্যাগে প্ররোচিত করছে, যা 'মেধাশূন্যতা'র ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক চিকিৎসা বিজ্ঞানী, ফার্মাসিস্ট এবং বায়োটেকনোলজিস্ট তৈরি করলেও, তাদের একটি বড় অংশ উন্নত গবেষণা সুবিধা এবং উচ্চতর বেতনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি ফর বাংলাদেশ' এ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মানবসম্পদ উন্নয়নের উপর জোর দিলেও, বাস্তবক্ষেত্রে অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং গবেষণামুখী পরিবেশের অভাব এই মেধা ধরে রাখাকে কঠিন করে তুলেছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদান, অত্যাধুনিক সরঞ্জাম এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপত্র প্রকাশের সুযোগ সীমিত। একটি সক্রিয় গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শদাতা (mentorship) এবং আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতার অভাবও প্রকট। ফলস্বরূপ, মেধাবী তরুণ গবেষকরা দেশে উদ্ভাবনী কাজ করার অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের চিকিৎসা গবেষণা খাতকে দুর্বল করে। এই দ্বিমুখী সংকট – পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব এবং মেধাবী গবেষকদের ধরে রাখতে না পারা – বাংলাদেশের ওষুধ গবেষণাকে এক জটিল চক্রে আবদ্ধ করে ফেলেছে।

সূচক বাংলাদেশ (২০২২-২৩) ভারত (২০২২) দক্ষিণ কোরিয়া (২০২২) বিশ্ব গড় (আনুমানিক)
জিডিপির % হিসাবে গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় ~০.১৫% ~০.৭% ~৪.৯% ~২.০%
স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের % হিসাবে গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় <০.১% ~১.০% ~৩.৫% ~২.৫%
প্রতি মিলিয়ন জনসংখ্যায় গবেষকের সংখ্যা (FTE) ~১৩০ ~২৫০ ~৭,৫০০ ~১,৫০০
বায়োটেক/ফার্মাসিউটিক্যাল পেটেন্ট আবেদন (বার্ষিক) <২০ ~১,২০০ ~১৫,০০০ তথ্য অপ্রাপ্য

উৎস: বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR) বার্ষিক প্রতিবেদন, বিশ্বব্যাংক (World Bank) ডেটাবেজ, ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিক্স (UNESCO Institute for Statistics) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার-কে অবিলম্বে স্বাস্থ্য গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বাজেট বরাদ্দকে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের কমপক্ষে ২% এ উন্নীত করতে হবে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক সুপারিশকৃত। এই বর্ধিত তহবিল 'বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (BMRC)' এবং 'জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ট্রাস্ট' এর মাধ্যমে উচ্চ-মানের মৌলিক ও ফলিত গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে এবং 'জাতীয় স্বাস্থ্য গবেষণা নীতি, ২০২২' এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ গবেষণা তহবিল গঠন করতে হবে।
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়-এর তত্ত্বাবধানে দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে (যেমন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়) অত্যাধুনিক বায়োটেকনোলজি ল্যাবরেটরি স্থাপন ও বিদ্যমান অবকাঠামো আধুনিকায়ন করতে হবে। 'জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ' কর্মসূচির আওতায় চিকিৎসা ও বায়োটেকনোলজি গবেষণায় উচ্চশিক্ষায়তনিক ফেলোশিপের সংখ্যা ও আর্থিক মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে মেধাবী গবেষকদের দেশে ধরে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • 'বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA)' এবং 'স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়' এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'বায়োফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা ও উন্নয়ন ইনসেনটিভ প্যাকেজ' চালু করতে হবে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে নতুন ওষুধ আবিষ্কার ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে। এর পাশাপাশি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এডিবি'র প্রযুক্তি সহায়তা কর্মসূচির সাথে সমন্বয় করে 'পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) আইন, ২০১৫' এর অধীনে চিকিৎসা গবেষণায় যৌথ উদ্যোগকে উৎসাহিত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সাবরিনা ইয়াসমিন

ড. সাবরিনা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator