আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সিনেমা ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার: তুলনামূলক বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সিনেমা ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার: তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ফারদিন খান  avatar   
ফারদিন খান
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সিনেমা ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সিনেমা ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত 'সৃজনশীল শিল্প উন্নয়ন তহবিল'-এর অধীনে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য প্রথম দফায় ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং ত...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত 'সৃজনশীল শিল্প উন্নয়ন তহবিল'-এর অধীনে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য প্রথম দফায় ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের (সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়) সক্রিয় পদক্ষেপে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে, শুধু বরাদ্দ প্রদানই যথেষ্ট নয়; এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি সুসংহত কৌশল প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজারের জটিল গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করে এগোতে হবে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র শিল্প যেভাবে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও গল্পকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিচ্ছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ এই মুহূর্তে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী দেশীয় দর্শকের উপর নির্ভরশীল হলেও, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এর যাত্রা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। যদিও গত এক দশকে কিছু স্বাধীন চলচ্চিত্রকার তাদের ব্যতিক্রমী কাজের জন্য কান, বার্লিন বা বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের মতো সম্মানজনক প্ল্যাটফর্মে প্রশংসিত হয়েছেন, কিন্তু এটি একটি বিচ্ছিন্ন সাফল্য মাত্র, যা সামগ্রিকভাবে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার প্রবেশে তেমন সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেনি। এর মূল কারণগুলির মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের প্রযোজনা, বিপণন ও বিতরণের অবকাঠামোগত অভাব। প্রতিবেশী দেশ ভারত বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো যেখানে তাদের চলচ্চিত্রকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে, সেখানে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এখনো আঞ্চলিক গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার মূলত নেটওয়ার্কিং, সহ-প্রযোজনা চুক্তি, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং উন্নত প্রযুক্তিগত মানদণ্ডের উপর নির্ভরশীল, যেখানে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক পরিবেশকদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকারের মতো বিষয়গুলো এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজারে প্রবেশ এবং এর অংশীদারিত্ব বাড়াতে হলে কেবল সৃজনশীলতার উপর নির্ভর করলেই চলবে না, প্রয়োজন একটি সুচিন্তিত বাণিজ্যিক কৌশল। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়া তাদের 'কোরিয়ান ফিল্ম কাউন্সিল' (KOFIC)-এর মাধ্যমে সরকারি অনুদান, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য সহায়তা এবং সহ-প্রযোজনা চুক্তির সুবিধা প্রদান করে। ইরান তাদের শক্তিশালী গল্প বলার ঐতিহ্য এবং কম বাজেট সত্ত্বেও বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক উৎসবে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, আমাদের রয়েছে নিজস্ব সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শক্তিশালী গল্পের ভাণ্ডার, যা বিশ্বব্যাপী দর্শকদের আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখে। তবে, এই গল্পগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের প্রযোজনা, ভিজ্যুয়াল এফেক্টস এবং সাউন্ড ডিজাইনের মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান ও বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। এছাড়া, চলচ্চিত্র শিক্ষার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের স্ক্রিনরাইটার ও পরিচালকদের প্রশিক্ষণ এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষার বিষয়ে কঠোর আইন প্রয়োগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হবে। World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর সৃজনশীল অর্থনীতিকে সমর্থন করার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়, যেখানে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্যও সুযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার কেবল প্রদর্শনীর জায়গা নয়, এটি একটি বিশাল বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম যেখানে বিনিয়োগ, সহ-প্রযোজনা এবং বিতরণ চুক্তির মাধ্যমে বিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়। বাংলাদেশের জন্য এই বাজারে প্রবেশাধিকার অর্জন করতে হলে শুধু সরকারি উদ্যোগই নয়, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বও অপরিহার্য। ফিল্ম ফান্ডিং, ট্যাক্স ইনসেনটিভ এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র কমিশনের মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বিদেশি প্রযোজকদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা যেতে পারে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ডেভেলপমেন্ট' বা 'কালচারাল হেরিটেজ প্রিজারভেশন' কর্মসূচির আওতায় চলচ্চিত্র শিল্পের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ বিকাশে সহায়তা করতে পারে। এই ধরনের সহায়তার মাধ্যমে আধুনিক স্টুডিও, পোস্ট-প্রোডাকশন সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।

সূচক ২০১৮ ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রচারে বরাদ্দ (কোটি টাকা) ০.৫০ ০.৭৫ ০.৪০ ১.৫০ ৩.০০
প্রধান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (A-List) নির্বাচিত বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের সংখ্যা ২ ৩ ১ ৪ ৩
দক্ষিণ এশিয়ায় World Bank ও ADB-এর সৃজনশীল অর্থনীতি প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ (বিলিয়ন USD) ০.৮৫ ০.৯২ ০.৭৮ ১.১০ ১.২৫
উক্ত বিনিয়োগে বাংলাদেশের অংশ (শতাংশ) ১.৫% ১.৮% ১.২% ২.০% ২.৫%
আন্তর্জাতিক পরিবেশকদের মাধ্যমে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের আনুমানিক রপ্তানি আয় (মিলিয়ন USD) ০.০৫ ০.০৮ ০.০৩ ০.১০ ০.১৫

উৎস: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন, World Bank ও ADB-এর বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আর্কাইভ।

সুপারিশ

  • জাতীয় চলচ্চিত্র নীতি, ২০১৯-এর সংশোধন ও পরিবর্ধন: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় (সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়) কর্তৃক 'জাতীয় চলচ্চিত্র নীতি, ২০১৯'-এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট 'আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার উন্নয়ন উপ-নীতি' প্রণয়ন করা অত্যাবশ্যক। এই উপ-নীতিতে আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনা চুক্তির আইনি কাঠামো, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ট্যাক্স ইনসেনটিভ এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষার জন্য কঠোর বিধিমালা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

  • আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার সম্প্রসারণ তহবিল গঠন: বাংলাদেশ সরকার-এর অর্থ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে একটি 'আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার সম্প্রসারণ তহবিল' গঠন করা হোক। এই তহবিল থেকে আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র প্রযোজনা, বিপণন ও বিতরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণ ও অনুদান প্রদান করা হবে। World Bank এবং ADB-এর 'ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ডেভেলপমেন্ট' কর্মসূচির আওতায় এই তহবিলের জন্য কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করবে।

  • 'আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার ও রপ্তানি উইং' স্থাপন: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (BFDC)-এর অধীনে একটি স্বতন্ত্র 'আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার ও রপ্তানি উইং' স্থাপন করা হোক। এই উইং-এর প্রধান কাজ হবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, বাজার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচার করা, বিদেশি পরিবেশক ও প্রযোজকদের সাথে নেটওয়ার্কিং তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক কো-প্রোডাকশনের সুযোগ অন্বেষণ করা।


✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারদিন খান

ফারদিন খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সিনেমা ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator