জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক অচলাবস্থা, বিশেষ করে গাজা ও ইউক্রেন সংঘাতের মতো চলমান বৈশ্বিক সংকট নিরসনে এর ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত...

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক অচলাবস্থা, বিশেষ করে গাজা ও ইউক্রেন সংঘাতের মতো চলমান বৈশ্বিক সংকট নিরসনে এর ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নীতি প্রণেতাদের দুর্বলতা নাকি পুরো ব্যবস্থারই অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা—এই প্রশ্নটি আবারও বিশ্ব মঞ্চে জোরালোভাবে উঠে এসেছে। বারবার ভেটো প্রয়োগের ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা আটকে যাওয়া এবং এর ফলে লাখ লাখ মানুষের জীবন ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়া, কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সামগ্রিক কার্যকারিতার ওপর গভীর প্রশ্ন তোলে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অঙ্গীকার এবং এর প্রয়োগের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

জাতিসংঘের সনদ, যা আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা। তবে, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাস্তবতার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল, তা প্রায়শই এই উদ্দেশ্য পূরণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন আন্তর্জাতিক আইনকে একটি পছন্দসই হাতিয়ারে পরিণত করেছে, যা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের সুবিধামতো ব্যবহার করে এবং অন্যদের উপর চাপিয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) কর্তৃক প্রদত্ত রায় বা নির্দেশিকাগুলো প্রায়শই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর দ্বারা উপেক্ষা করা হয়, যা আইনের সর্বজনীন প্রয়োগের ধারণাকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে, আন্তর্জাতিক আইন কেবল দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য প্রযোজ্য বলে এক ধরনের ধারণা তৈরি হয়, যেখানে শক্তিশালীরা দায়মুক্তি ভোগ করে। এই দ্বৈত মানদণ্ড আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের বীজ বপন করে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) যদিও বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তবে এর কার্যকারিতাও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। শান্তিরক্ষী বাহিনীর জন্য পর্যাপ্ত রসদ, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং কঠোর ম্যান্ডেট না থাকায় অনেক সময় মিশনগুলো তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেমন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম শীর্ষ সেনা ও পুলিশ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে অবদান রেখে আসছে, যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় একটি উন্নয়নশীল দেশের অঙ্গীকারের দৃষ্টান্ত। তবে, বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর মাঝে যখন রাজনৈতিক ঐক্য থাকে না, তখন শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর পক্ষে নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) এবং সার্ক (সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন) যদিও আঞ্চলিক সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট, তবে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ বা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা প্রায়শই সীমাবদ্ধ থাকে। এই সংস্থাগুলো সাধারণত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের উপর বেশি জোর দেয় এবং গুরুতর নিরাপত্তা বা বিচারিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘের মতো শক্তিশালী ম্যান্ডেট বা ক্ষমতা তাদের থাকে না। ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক আইনের ফাঁকফোকরগুলো এই আঞ্চলিক কাঠামোর মাধ্যমে পূরণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, যা বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তোলে।

সূচক ২০১০ ২০১৫ ২০২০ ২০২৩
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে মোট কর্মী সংখ্যা (আনুমানিক) ১,২৪,৯১৮ ১,০৪,০৫১ ৮২,৩০২ ৭৬,৯৮৩
শান্তিরক্ষা বাজেট (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ৭.৮৩ ৮.২৬ ৬.৫৩ ৬.০৪
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রয়োগের সংখ্যা (গড় বার্ষিক) ২.৬ ৪.২ ৪.৮ ৩.৫
বাংলাদেশ কর্তৃক শান্তিরক্ষী অবদান (শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে) ৮ম ২য় ১ম ২য়

উৎস: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম (UN Peacekeeping Operations), জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UN Security Council) এবং স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)

সুপারিশ

  • জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা সংস্কার করতে হবে, বিশেষ করে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা সীমিত করা বা স্থগিত করার জন্য জাতিসংঘের সনদের ২৭ অনুচ্ছেদে সংশোধনী আনতে হবে। প্রয়োজনে আঞ্চলিক শক্তির জন্য অস্থায়ী বা আংশিক ভেটো ক্ষমতা বিবেচনা করা যেতে পারে।
  • আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)-এর রায় ও নির্দেশিকা বাস্তবায়নে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে (UN General Assembly) আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালনের ক্ষমতা দিতে হবে। বিশেষ করে, যে রাষ্ট্রগুলো ICJ বা ICC-এর রায় অমান্য করে, তাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সনদের ষষ্ঠ অধ্যায়ের (Chapter VI) আওতায় কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের প্রক্রিয়াকে সুনির্দিষ্ট ও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে।
  • UN Peacekeeping মিশনগুলোর জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক প্রতিশ্রুতি বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের "পিসবিল্ডিং কমিশন" (Peacebuilding Commission)-কে আরও শক্তিশালী ম্যান্ডেট ও সংস্থান দিতে হবে। এর পাশাপাশি, BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকে তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবাধিকার রক্ষায় জাতিসংঘের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করার জন্য একটি সমন্বিত নীতি কাঠামো তৈরি করতে উৎসাহিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator