বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও… | আই নিউজ বিডি

বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশের একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জনমত এবং নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে চলমান বিতর্ক রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জনবিশ্ব...

সম্প্রতি, বাংলাদেশের একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জনমত এবং নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে চলমান বিতর্ক রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জনবিশ্বাসের গুরুত্বকে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। বিশেষত, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় সুশীল সমাজের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব প্রায়শই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা হ্রাস করে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি গবেষণা প্রতিবেদনে নির্বাচনী ব্যয়, রাজনৈতিক দলের তহবিল সংগ্রহ এবং প্রার্থীর হলফনামা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান অস্বচ্ছতার দিকগুলো সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, যা নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা অর্জনে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, 'বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ' শীর্ষক এই বিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং জনবিশ্বাস প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বেশকিছু সত্য ও মিথের মুখোমুখি হতে হয়। একটি প্রচলিত মিথ হলো, শুধুমাত্র নির্বাচনের দিনে ভোটদান প্রক্রিয়া অবাধ ও সুষ্ঠু হলেই সামগ্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা স্বচ্ছ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে ফলাফল গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ – ভোটার তালিকা হালনাগাদ, সীমানা নির্ধারণ, মনোনয়নপত্র জমা ও যাচাই, নির্বাচনী প্রচারণায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতকরণ, নির্বাচনী ব্যয় পর্যবেক্ষণ, এবং নির্বাচন-পরবর্তী অভিযোগ নিষ্পত্তি – প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা অত্যাবশ্যক। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ না করলেও, তাদের নীতি ও সিদ্ধান্ত পরোক্ষভাবে নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনকালে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের ভূমিকা নিশ্চিতকরণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। যদি এই প্রক্রিয়াগুলোতে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি থাকে, তবে তা নির্বাচনী ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, এমনকি আপাতদৃষ্টিতে সুষ্ঠু ভোট হলেও। এটি একটি মৌলিক সত্য যে, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি হয় পুরো প্রক্রিয়ার সততা ও স্বচ্ছতার ওপর ভিত্তি করে, কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনের কার্যক্রমে নয়।

রাজনৈতিক স্বচ্ছতা কেবল নির্বাচনের পূর্ববর্তী বা পরবর্তী কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম, তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয়, এবং নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আয়ের উৎস এবং ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে অনীহা দেখায়, যা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের অস্বচ্ছতা তৈরি করে। এই অস্বচ্ছতা দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে এবং কালো টাকার প্রভাবকে উৎসাহিত করে, যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সমতাকে ব্যাহত করে। World Bank এবং ADB (Asian Development Bank) এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের সুশাসন ও প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নিয়মিতভাবে পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করে থাকে। তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে নির্বাচনী অর্থায়ন, দুর্নীতি দমন এবং সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, World Bank-এর 'Worldwide Governance Indicators' (WGI) এ বাংলাদেশের 'Voice and Accountability' এবং 'Control of Corruption' সূচকগুলো প্রায়শই দুর্বল অবস্থানে থাকে, যা সরাসরি নির্বাচনী ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই সূচকগুলো নির্দেশ করে যে, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ এবং দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেও আরও শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং জবাবদিহিতার অভাব দেখা যায়, সেখানে এই ধরনের সূচকগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশের জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্নেন্স ইনডিকেটরস (WGI) এর নির্বাচিত সূচক
সূচক ২০১০ (পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক) ২০১৫ (পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক) ২০২০ (পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক)
ভয়েস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিবিলিটি (Voice & Accountability) ৩২.৭৪% ২৯.৮১% ২২.৬২%
কন্ট্রোল অব করাপশন (Control of Corruption) ২৭.৮৮% ২৩.৫৫% ১৯.৭২%
গভর্নমেন্ট ইফেক্টিভনেস (Government Effectiveness) ৩২.১৯% ২৮.৫৭% ২৪.৮৭%

উৎস: World Bank, Worldwide Governance Indicators (WGI) - Bangladesh Data

সুপারিশ

  • নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে এবং এর জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২-এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো সংশোধন করে ইসির নিজস্ব বাজেট প্রণয়ন ও ব্যয়ের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে হবে।
  • রাজনৈতিক দলের তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা আনতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২-এর ধারা ৯০বি (90B) এবং ৯০সি (90C) কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং অডিট রিপোর্টের বিশদ বিবরণ জনসমক্ষে বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করার বিধান যুক্ত করতে হবে।
  • তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ (Right to Information Act, 2009) এর আওতায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সকল তথ্য, যেমন ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নির্বাচনী ব্যয় নিরীক্ষা প্রতিবেদন, এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির বিস্তারিত তথ্য, সময়সীমার মধ্যে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে প্রকাশের জন্য নির্বাচন কমিশনকে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator