বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

আকমল হোসেন  avatar   
আকমল হোসেন
বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (BFSA) দেশব্যাপী পরিচালিত সাঁড়াশি অভিযানে প্রায়শই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ...

সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (BFSA) দেশব্যাপী পরিচালিত সাঁড়াশি অভিযানে প্রায়শই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে ভয়াবহ ভেজাল ও ক্ষতিকারক রাসায়নিকের উপস্থিতি ধরা পড়ছে। কেবল ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাজারেই গত ছয় মাসে দুধ, মিষ্টি, ফলের রস, তেল এবং মসলার মতো প্রায় ৩০০টি নমুনার মধ্যে ৭০% এর বেশি নমুনায় জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্র তুলে ধরে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি কেবল জনস্বাস্থ্যের প্রতিই হুমকি নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এমন প্রেক্ষাপটে, দেশের ফুড সেফটি ল্যাবগুলোর সক্ষমতা, আধুনিকীকরণ এবং কার্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ল্যাবরেটরিগুলোর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অধিকাংশ ল্যাবেই আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব প্রকট। বিশেষ করে, ভারী ধাতু, অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ, কীটনাশক এবং মাইক্রোবায়োলজিক্যাল দূষণ শনাক্তকরণের জন্য অত্যাধুনিক বিশ্লেষণের সরঞ্জাম যেমন গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি-মাস স্পেকট্রোমেট্রি (GC-MS), হাই পারফরম্যান্স লিকুইড ক্রোমাটোগ্রাফি (HPLC) এবং পারমাণবিক শোষণ স্পেকট্রোমেট্রি (AAS) পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। যে কয়েকটি ল্যাবে এসব সরঞ্জাম রয়েছে, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্রমাঙ্কন (calibration) ব্যবস্থাও ত্রুটিপূর্ণ। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (BARC) অধীনে কিছু ল্যাব থাকলেও, সেগুলোর পরীক্ষা পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড যেমন ISO 17025 অনুযায়ী পুরোপুরি স্বীকৃত নয়। ফলে, এসব ল্যাবের পরীক্ষার ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই বাণিজ্য ও ভোক্তা সুরক্ষাকে ব্যাহত করে। প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ; ল্যাব টেকনিশিয়ান এবং বিজ্ঞানীরা প্রায়শই সর্বশেষ বিশ্লেষণাত্মক কৌশল এবং যন্ত্রপাতির ব্যবহারে দক্ষ নন। এই সীমাবদ্ধতাগুলো ভেজাল খাদ্য চিহ্নিতকরণে বিলম্ব ঘটায় এবং অনেক সময় ভুল ফলাফলের দিকে পরিচালিত করে, যা ভেজালকারীদের পার পেয়ে যেতে সাহায্য করে।

ফুড সেফটি ল্যাবগুলোর এই সংকট নিরসনে অর্থায়ন এবং নীতিগত সহায়তার অভাব দীর্ঘদিন ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, যদিও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দায়বদ্ধতা স্বীকার করে, তবে ল্যাবরেটরি অবকাঠামো উন্নয়নে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ প্রায়শই অপ্রতুল থাকে। World Bank এবং Asian Development Bank (ADB) বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও কৃষিখাতে বিভিন্ন প্রকল্পে সহায়তা করলেও, খাদ্য নিরাপত্তা ল্যাবগুলোর সামগ্রিক আধুনিকীকরণে সুনির্দিষ্ট ও বৃহৎ আকারের বিনিয়োগ প্রকল্প এখনো সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, World Bank এর সহায়তায় পরিচালিত কিছু স্বাস্থ্যখাত উন্নয়ন প্রকল্পে পরোক্ষভাবে খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট গবেষণার সুযোগ থাকলেও, সরাসরি ল্যাবরেটরিগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প খুব কম। বাংলাদেশ সরকার যদিও খাদ্য নিরাপত্তা আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে, কিন্তু এই আইনের কার্যকর প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি সহায়তা এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয় (যেমন BFSA, BSTI, স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে) প্রায়শই দুর্বল। এই দুর্বল সমন্বয়ের কারণে দ্রুত নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যায়, যা ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।

তবে, এই সংকটের মধ্যেও কিছু আশার আলো দেখা যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য দেশ থেকে খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের কঠোর শর্ত আরোপের ফলে ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু ফুড সেফটি ল্যাব আধুনিকীকরণের জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং কিছু ল্যাবে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রপ্তানিমুখী খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পগুলো নিজস্ব উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাব প্রতিষ্ঠা করছে, যা একটি ইতিবাচক প্রবণতা। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব, যা সরকারি, বেসরকারি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করবে। এর মাধ্যমে কেবল অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নয়, বরং বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণেও সহায়ক হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

প্রতিষ্ঠানের নাম সাল মোট পরীক্ষিত নমুনার সংখ্যা ভেজালযুক্ত নমুনার সংখ্যা ভেজালের হার (%) প্রধান ভেজালের প্রকার
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH) ২০১৯ ৩,৫০০ ১,০৫০ ৩০.০০ ফরমালিন, রং, স্টার্চ
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) ২০২০ ৪,২০০ ১,৩০০ ৩১.০০ সিস্টেম্যাটিক ফেইলিওর, নিম্নমান
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) ২০২১ ৩,৮০০ ১,২০০ ৩১.৫৭ ফরমালিন, কীটনাশক, মাইক্রোবিয়াল
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH) ২০২২ ৪,০০০ ১,২০০ ৩০.০০ ভারী ধাতু, অ্যান্টিবায়োটিক
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) ২০২৩ ৪,৫০০ ১,৪৫০ ৩২.২২ ফরমালিন, নিষিদ্ধ রাসায়নিক

উৎস: সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের বার্ষিক প্রতিবেদন (IPH, BSTI, BFSA) থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে।

সুপারিশ

  • খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি 'জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ল্যাবরেটরি আপগ্রেডেশন পরিকল্পনা' ২০২৫ সালের মধ্যে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে। এই পরিকল্পনার আওতায় বিদ্যমান সকল সরকারি খাদ্য নিরাপত্তা ল্যাবকে ISO 17025 আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আপগ্রেড ও স্বীকৃতি প্রদানের জন্য World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় আগামী পাঁচ বছরের জন্য ১০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। এই বরাদ্দ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়, ল্যাব টেকনিশিয়ানদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবহৃত হবে।
  • বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI)-এর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে খাদ্য নিরাপত্তা আইন, ২০১৩-এর ধারা ২৫ অনুযায়ী একটি শক্তিশালী 'জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা সমন্বয় কমিটি' গঠন করা হবে। এই কমিটি নিয়মিত বাজার তদারকি, দ্রুত নমুনা পরীক্ষা, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স পরিচালনা করবে। এই কমিটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রতি ছয় মাস অন্তর একটি স্বাধীন নিরীক্ষা কমিটি দ্বারা এর কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগে একটি ব্যাপক 'জাতীয় নিরাপদ খাদ্য জনসচেতনতা কর্মসূচি' চালু করবে, যা ভেজাল খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এবং বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (BMRC)-এর অধীনে খাদ্য বিজ্ঞান ও নিরাপদ খাদ্য প্রযুক্তির উপর গবেষণার জন্য প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট বাজেট (যেমন: ১০০ কোটি টাকা) বরাদ্দ করবে, যা ভেজাল প্রতিরোধে নতুন পদ্ধতি ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং দেশীয় খাদ্যপণ্যের মানোন্নয়নে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আকমল হোসেন

আকমল হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator