পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

সায়েম মালিক  avatar   
সায়েম মালিক
পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষভ...

সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দেয় যে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি খাত জলবায়ু পরিবর্তন এবং উজানের দেশগুলোর পানি প্রত্যাহারের কারণে মারাত্মক সংকটে পড়তে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক পরিচালিত সেচ প্রকল্পগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এই প্রেক্ষাপটে, পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত বিনিয়োগ, বিদ্যমান ঝুঁকিগুলোর সঠিক পরিমাপ এবং সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহার বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

বাংলাদেশের ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৩টির উৎস ভারত এবং মিয়ানমার। এই নদীগুলোর পানি প্রবাহে উজানের দেশগুলোর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, যেমন বাঁধ নির্মাণ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং সেচ ব্যবস্থা, সরাসরি প্রভাব ফেলে। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন ইস্যুটি এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যা বছরের পর বছর ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের বিশাল কৃষি জমি, বিশেষ করে বোরো ধান চাষ, মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। DAE'র তথ্যমতে, তিস্তা সেচ প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১.৫ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়, যা পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় প্রতি বছরই ক্ষতির সম্মুখীন হয়। গঙ্গা নদীর পানি প্রবাহে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ, যা কৃষি জমিকে অনুর্বর করে তুলছে এবং মিঠাপানির উৎসকে সংকটাপন্ন করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবনে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু উজানের পানি প্রবাহের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা না গেলে এই ধরনের গবেষণা কেবল সাময়িক সমাধান হিসেবেই বিবেচিত হবে। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে কার্যকর ও ন্যায্য চুক্তি না থাকলে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অভ্যন্তরীণভাবেও বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা বহুবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং অপরিকল্পিত কৃষি পদ্ধতির কারণে ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক উত্তোলন একটি বড় সমস্যা। DAE-এর তথ্য অনুযায়ী, মোট সেচকৃত এলাকার প্রায় ৭৮% ভূগর্ভস্থ পানি দ্বারা পরিচালিত হয়, যা পানির স্তরকে আশঙ্কাজনকভাবে নামিয়ে দিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সেচ খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে সুপেয় পানির সংকটও তীব্র হচ্ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) যদিও স্বল্পমেয়াদী, খরা-সহনশীল এবং লবণাক্ততা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে (যেমন BRRI ধান২৯, BRRI ধান৬৭, BARI ভুট্টা-৯), যা পানির ব্যবহার কিছুটা কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু এটি ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমানোর একটি আংশিক সমাধান মাত্র। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের নদী, খাল, বিল এবং অন্যান্য জলাশয় শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য এবং কৃষি রাসায়নিকের কারণে মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এই দূষণ শুধু মিঠাপানির উৎসগুলোকেই নষ্ট করছে না, বরং মৎস্য সম্পদ এবং জলজ জীববৈচিত্র্যকেও বিপন্ন করছে। হাওর, বাওড় ও বিলের মতো প্রাকৃতিক জলাধারগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা একদিকে যেমন বন্যা পরিস্থিতিকে জটিল করছে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব তৈরি করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য একটি সমন্বিত এবং সুদূরপ্রসারী জাতীয় পানি নীতি বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি, যেখানে পরিবেশগত ভারসাম্য এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হবে।

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগের অভাব এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না করা হলে দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদিও সরকার বিভিন্ন সময়ে পানি সম্পদ উন্নয়নে মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে, তবে সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত পরিকল্পনা, যা পানি সম্পদ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দিকনির্দেশনা দেয়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, যার জন্য দেশীয় সম্পদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তাও অপরিহার্য। নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার, উপকূলীয় বাঁধ সুরক্ষা, এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তন এই পরিকল্পনার মূল অংশ। তবে, শুধু অবকাঠামোগত বিনিয়োগই যথেষ্ট নয়; পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং জলাভূমি সংরক্ষণে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা হলে তা তৃণমূল পর্যায়ে পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট নতুন নতুন ঝুঁকি যেমন আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি মোকাবেলা করার জন্য অভিযোজন কৌশলগুলোতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা প্রয়োজন, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনজীবনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।

সূচক ২০১০ সাল ২০২০ সাল উৎস
মোট সেচকৃত এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার (শতাংশ) ৭২% ৭৮% DAE
লবণাক্ততা প্রভাবিত কৃষি জমির পরিমাণ (মিলিয়ন হেক্টর) ১.০৫ ১.১৮ পরিবেশ মন্ত্রণালয়
BRRI উদ্ভাবিত স্বল্প পানি ব্যবহারকারী ধান জাতের আওতাধীন এলাকা বৃদ্ধি (শতাংশ) ৬% ১৩% BRRI
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ (বিলিয়ন টাকা) ১৫.৮ ২৫.৫ পরিকল্পনা কমিশন
BARI উদ্ভাবিত খরা-সহনশীল ফসলের জাতের সংখ্যা ৪ ৯ BARI

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE), পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), এবং পরিকল্পনা কমিশন (২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত)।

সুপারিশ

  • আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তিসহ অন্যান্য ৫৩টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে Joint Rivers Commission (JRC) এর মাধ্যমে দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনা সম্পন্ন করা। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদীগুলোর অ-নেভিগেশনাল ব্যবহার সম্পর্কিত কনভেনশন, ১৯৯৭ (UN Convention on the Law of the Non-Navigational Uses of International Watercourses, 1997) এর নীতিমালা অনুসরণ করে একটি ন্যায্য ও টেকসই পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করা, যা শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ নিশ্চিত করবে।
  • ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক ব্যবহার কমাতে এবং পানির অপচয় রোধে একটি জাতীয় পানি মূল্য নির্ধারণ নীতি (National Water Pricing Policy) এবং কার্যকর প্রণোদনা ব্যবস্থা চালু করা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর সহযোগিতায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে সারফেস ওয়াটার ব্যবহারের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে এবং আধুনিক, পানি-সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি (যেমন ড্রিপ ইরিগেশন, স্প্রিংকলার) ব্যবহারে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে, যা বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩ এর আওতায় বাস্তবায়নযোগ্য।
  • জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ (Bangladesh Delta Plan 2100) এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (National Adaptation Plan - NAP) এর আলোকে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বৃহৎ পরিসরে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে এই বিনিয়োগের মাধ্যমে উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ ও শক্তিশালীকরণ, নদী খনন, জলাভূমি পুনরুদ্ধার (হাওর, বাওড়), এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting) ও ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ (Managed Aquifer Recharge - MAR) প্রকল্পগুলোতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সায়েম মালিক

সায়েম মালিক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator