অপ্রকাশিত সত্য: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

জাহিদ রিজভি  avatar   
জাহিদ রিজভি
অপ্রকাশিত সত্য: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ফিফা ফরওয়ার্ড ৩.০ কর্মসূচির অধীনে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (BFF) কে বরাদ্দকৃত প্রায় ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বড় অংশ নিয়ে নতুন কর...

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ফিফা ফরওয়ার্ড ৩.০ কর্মসূচির অধীনে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (BFF) কে বরাদ্দকৃত প্রায় ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বড় অংশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি ফুটবল একাডেমি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ থমকে আছে অথবা শুরুই হয়নি। ফিফার বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্য যেখানে সদস্য দেশগুলির ফুটবলের তৃণমূল স্তরকে শক্তিশালী করা, সেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অর্থায়ন কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে এবং ক্রীড়া মহলে গভীর উদ্বেগ বিদ্যমান। বিশেষ করে, যখন দেশের জাতীয় ফুটবল দল আন্তর্জাতিক মঞ্চে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে, তখন এই বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক অনুদানের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা কেন সম্ভব হচ্ছে না, সেই প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বড়।

ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়নের জন্য ফিফা ফরওয়ার্ড কর্মসূচির অধীনে প্রতি চার বছর অন্তর প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই অর্থ সরাসরি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (BFF) অ্যাকাউন্টে জমা হয় এবং এর উদ্দেশ্য হলো যুব ফুটবল একাডেমি স্থাপন, স্থানীয় লিগ আয়োজন, কোচিং ও রেফারি প্রশিক্ষণ, এবং ফুটবল অবকাঠামো উন্নত করা। তবে গত কয়েক দশক ধরে দেখা যাচ্ছে, এই তহবিল বিতরণে স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো অভিযোগ করে যে, তাদের কাছে পর্যাপ্ত তহবিল পৌঁছায় না, যার ফলস্বরূপ স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণ ও বিকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, এই তহবিল ব্যবহারের উপর পর্যাপ্ত নজরদারি করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে, যা পরোক্ষভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে, ফুটবলের মূল ভিত্তি, অর্থাৎ তৃণমূল পর্যায়, দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে, এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের ফুটবল কাঠামোর উপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই পরিস্থিতি World Bank বা ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কঠোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী, যেখানে প্রতিটি ধাপেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক।

তৃণমূল পর্যায়ে অর্থায়নের এই অব্যবস্থাপনা কেবলমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। যখন স্থানীয় ক্লাবগুলো আর্থিক সংকটে ভুগে, তরুণ খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণের জন্য সুযোগ থাকে না, এবং খেলার মাঠের অভাবে শিশুরা ফুটবল থেকে দূরে সরে যায়, তখন জাতীয় পর্যায়ে মানসম্পন্ন খেলোয়াড়ের সরবরাহ কমে যায়। এই সমস্যাটি কেবল বর্তমান জাতীয় দলের পারফরম্যান্সের উপর প্রভাব ফেলছে না, বরং আগামী প্রজন্মের খেলোয়াড়দের বিকাশের পথও রুদ্ধ করছে। উদাহরণস্বরূপ, বহু জেলায় এখনো মানসম্মত ফুটবল মাঠ নেই, স্থানীয় লিগগুলো নিয়মিত আয়োজিত হয় না, এবং প্রশিক্ষিত কোচের অভাব তীব্র। ফিফা থেকে প্রাপ্ত অর্থ যদি এই মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে ব্যবহৃত না হয়, তবে তা একটি দেশের ফুটবলের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। বাংলাদেশ সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারণ ক্রীড়া উন্নয়ন কেবল বিনোদন নয়, এটি যুবকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং সামাজিক সংহতি বৃদ্ধিতেও সহায়ক। সঠিক বিনিয়োগ এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে এই অর্থ যদি তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছানো যায়, তবেই ফুটবলের সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যা দেশের ক্রীড়া অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সময়কাল ফিফা ফরওয়ার্ড মোট বরাদ্দ (আনুমানিক) বিএফএফ কর্তৃক ঘোষিত তৃণমূল ব্যয় প্রকৃত তৃণমূল প্রকল্পগুলিতে দৃশ্যমান ব্যয়
২০১৬-২০১৮ (১.০ চক্র) $৫.২ মিলিয়ন $২.৪ মিলিয়ন $৭০০,০০০
২০১৯-২০২২ (২.০ চক্র) $৭.৫ মিলিয়ন $৩.১ মিলিয়ন $১.২ মিলিয়ন
২০২৩-২০২৫ (৩.০ চক্র, প্রক্ষেপিত) $৮.০ মিলিয়ন $১.৮ মিলিয়ন (এখনও পর্যন্ত) $৩০০,০০০ (এখনও পর্যন্ত)

উৎস: FIFA Annual Report (বিভিন্ন সংস্করণ), বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (BFF) অডিট রিপোর্ট (অনুমাননির্ভর)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বাধীন অডিট কমিটি গঠন করবে, যা ফিফা থেকে প্রাপ্ত তহবিলের নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক অডিট নিশ্চিত করবে এবং এর প্রতিবেদন প্রতি ছয় মাসে জনসম্মুখে প্রকাশ করবে। এই কমিটি World Bank এর আর্থিক স্বচ্ছতা নির্দেশিকা অনুসরণ করে কাজ করবে।
  • বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (BFF) জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে সরাসরি তৃণমূল উন্নয়ন প্রকল্পগুলির জন্য তহবিল বরাদ্দ করবে। এই তহবিল বিতরণে World Bank এর 'Procurement Framework' এর আদলে একটি কঠোর ও স্বচ্ছ ক্রয় এবং মনিটরিং প্রক্রিয়া চালু করতে হবে, যেখানে প্রতিটি ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ অনলাইনে প্রকাশ করা হবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়) জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালায় ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়নের জন্য একটি বাধ্যতামূলক '৫ বছর মেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা' অন্তর্ভুক্ত করবে। এই পরিকল্পনা ADB-এর উন্নয়ন প্রকল্পগুলির মতো সুনির্দিষ্ট কর্মক্ষমতা ভিত্তিক সূচক (KPI) দ্বারা পরিমাপযোগ্য হবে এবং প্রতি বছর এর অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য একটি বার্ষিক প্রতিবেদন সংসদীয় কমিটিতে জমা দিতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহিদ রিজভি

জাহিদ রিজভি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator