অপ্রকাশিত সত্য: চামড়া ও পাদুকাশিল্প নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: চামড়া ও পাদুকাশিল্প নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

শাজাহান মিয়া  avatar   
শাজাহান মিয়া
অপ্রকাশিত সত্য: চামড়া ও পাদুকাশিল্প নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: চামড়া ও পাদুকাশিল্প নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
অপ্রকাশিত সত্য: চামড়া ও পাদুকাশিল্প নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

অপ্রকাশিত সত্য: চামড়া ও পাদুকাশিল্প নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

২০২৩ সালের শেষ দিকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কমন এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) সম্পূর্ণ কার্যকর না হওয়ায় আবারও যখন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়ছিল, তখন শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ আসে। এই নির্দেশনার পরপরই প্রশ্ন উঠেছে, প্রায় এক দশক আগে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য— পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করে রপ্তানি বৃদ্ধি — কতটা অর্জিত হয়েছে? প্রায় ১,০৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এই শিল্পনগরী আজও তার পূর্ণ সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় ঘনীভূত হচ্ছে।

চামড়া ও পাদুকাশিল্প বাংলাদেশের জন্য একসময় পোশাকশিল্পের পরের বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচিত হতো। ২০০৩ সালে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে সাভারের চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পের সূচনা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল পরিবেশগত ঝুঁকির মোকাবেলা করে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা। কিন্তু সিইটিপি'র অকার্যকারিতা, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই শিল্পনগরী আজও লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন (LEED) বা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (LWG) সার্টিফিকেশন অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে, উচ্চমানের আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশের চামড়া পণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, যা সরাসরি দেশের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সাথে, পরিবেশ অধিদপ্তরের কঠোর মনিটরিং সত্ত্বেও বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর দূষণ অব্যাহত রয়েছে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।

এই খাতের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অংশীদার যেমন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন সময়ে কারিগরি সহায়তা ও ঋণ প্রদান করেছে, যা মূলত অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশগত মানোন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (SME) সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যয়িত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এসব তহবিলের সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বব্যাংকের পরিবেশগত টেকসইকরণ প্রকল্পের আওতায় প্রদত্ত তহবিল ব্যবহার করে সাভারের সিইটিপি'র আধুনিকায়ন এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন প্রক্রিয়া বারবার বিলম্বিত হয়েছে। এর ফলস্বরূপ, একদিকে যেমন কাঁচা চামড়ার মূল্য সংযোজন কমেছে, তেমনি অন্যদিকে প্রস্তুতকৃত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ সরকার রপ্তানি নীতি ২০২১-২০২৪ এর অধীনে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে ‘অগ্রাধিকার খাত’ হিসেবে ঘোষণা করলেও, মাঠ পর্যায়ে টেকসই উন্নয়নের অভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে, স্থানীয়ভাবে দক্ষ শ্রমিকের অভাব, আধুনিক ডিজাইন ও প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগের অনীহা এবং স্থানীয় ট্যানারিগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এই খাতের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

চামড়া ও পাদুকাশিল্পে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো শুধুমাত্র পরিবেশগত বা অবকাঠামোগত নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে সাপ্লাই চেইন এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সাথেও জড়িত। কাঁচা চামড়া সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানের অনুপস্থিতি এই খাতকে পিছিয়ে রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, ঈদের সময় কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় এখনও সনাতন পদ্ধতির ব্যবহার এবং সঠিক মূল্যের অভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হচ্ছে। এর পাশাপাশি, চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহার এবং বর্জ্য থেকে সম্পদ আহরণের (Waste to Resource) মতো উদ্ভাবনী ধারণাগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এই খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন নীতি ও প্রণোদনা ঘোষণা করলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং কার্যকর তদারকির অভাবে প্রত্যাশিত ফলাফল আসছে না। এই পরিস্থিতি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টিতেও বাধা সৃষ্টি করছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য রপ্তানি সুযোগ নষ্ট করছে।

সাল কাঁচা চামড়া ও আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পাদুকা রপ্তানি (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মোট চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)
২০১৮-১৯ ১০৯.৫৬ ৩৩৪.৮৮ ৫০২.৫৫ ৯৪৬.৯৯
২০১৯-২০ ৭০.৩৪ ২৫৫.২৩ ৪৬৬.১১ ৭৯১.৬৮
২০২০-২১ ৪৭.৮৯ ২৫৬.৯৩ ৬২৫.১২ ৯২৯.৯৪
২০২১-২২ ৫১.৬৭ ৪৩১.১৭ ৭৮৫.৪২ ১,২৬৮.২৬
২০২২-২৩ ৪১.১০ ৪০৩.৫৬ ৭৫৮.১৩ ১,২০২.৭৯

উৎস: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক

সুপারিশ

  • শিল্প মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কমন এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টের শতভাগ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এর অধীনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) যৌথভাবে চামড়া ও পাদুকাশিল্পের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, ডিজাইন উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার উপযোগী পণ্য উৎপাদনে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করবে। একই সাথে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে তহবিল প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষ ঋণ প্রকল্প চালু করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর মাধ্যমে, আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (LWG) সার্টিফিকেশন অর্জনে স্থানীয় ট্যানারিগুলোকে সহায়তা করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করবে। এর পাশাপাশি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য প্রধান বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা কাজে লাগাতে এবং নতুন বাজার অন্বেষণে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাজাহান মিয়া

শাজাহান মিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চামড়া ও পাদুকাশিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator