বন ও বন্যপ্রাণী পাচার: দুর্নীতির জালে বিপন্ন বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বন ও বন্যপ্রাণী পাচার: দুর্নীতির জালে বিপন্ন বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য

শারমিন সুলতানা  avatar   
শারমিন সুলতানা
বন ও বন্যপ্রাণী পাচার: দুর্নীতির জালে বিপন্ন বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য
বন ও বন্যপ্রাণী পাচার: দুর্নীতির জালে বিপন্ন বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এক গভীর সংকটের মুখে। বন ও বন্যপ্রাণী পাচার, বনভূমি দখল এবং বন বিভাগের অভ্যন্তরে দুর্নীতির মতো গুরুতর অনিয়মগুলো দে...

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এক গভীর সংকটের মুখে। বন ও বন্যপ্রাণী পাচার, বনভূমি দখল এবং বন বিভাগের অভ্যন্তরে দুর্নীতির মতো গুরুতর অনিয়মগুলো দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদকে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা ও তদন্তে উঠে এসেছে এই খাতের ভয়াবহ চিত্র, যা কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 'আই নিউজ বিডি'র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও দুর্বল প্রয়োগ, জবাবদিহিতার অভাব এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যার ফলে বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

বন্যপ্রাণী পাচারের দৌরাত্ম্য বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের (WCCU) তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬০,২০৯টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হলেও, দুই হাজারের বেশি ঘটনায় মাত্র ২৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এটি আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে। সম্প্রতি, ২০২৩ সালের জুন মাসে রাজধানীর মিরপুরের একটি গুদাম থেকে ৪২টি বিরল ও বিপন্ন বন্যপ্রাণী (ইগলপ্যাঁচা, চশমাপরা হনুমান, রাজধনেশ, পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপ) উদ্ধার করা হয়। এর এক মাস পর, জুলাই মাসে রূপনগর থেকে ১,১০৪টি বিদেশি বন্যপ্রাণী, যার মধ্যে মেক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেক, বিষাক্ত টারান্টুলা, ডাম্পি ব্যাঙ এবং বিপুল সংখ্যক কচ্ছপ ছিল, উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ এখন কেবল বন্যপ্রাণীর উৎস দেশ নয়, বরং আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের ২৮টি দেশের মধ্যে অন্যতম, যারা বন্যপ্রাণী পাচারের উৎস, ভোক্তা এবং প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট। চোরাকারবারিরা বিমানবন্দর ও সীমান্তপথ ব্যবহার করে দুবাই, কাতার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে প্রাণী পাচার করছে। এমনকি, একই ব্যক্তিরা বারবার এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এবং আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে, যেমন হাদিস রহমান নামের একজন পাচারকারী একাধিকবার ধরা পড়েও সক্রিয় ছিল।

বন বিভাগের অভ্যন্তরে দুর্নীতি ও অনিয়ম এই পাচার চক্রকে আরও শক্তিশালী করছে। সুফল (টেকসই বন ও জীবিকা) প্রকল্পে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বাগান সৃজন না করে দেড় কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের মূলহোতা সাদেকুর রহমানকে শাস্তির পরিবর্তে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযান চালায়। অভিযানে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসাইন চৌধুরীর অধীনে প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব এবং চারা রোপণের নামে বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে গাছের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। এছাড়া, শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় বালিজুড়ী রেঞ্জের সাবেক রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের প্রায় ৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। চট্টগ্রামের বন বিভাগেও মোল্লা রেজাউল করিম নামের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে 'মোল্লা বাহিনী' গঠন করে চাঁদাবাজি, ৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং সরকারি বাড়ি ভাড়া দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এই ধরনের দুর্নীতি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বনভূমিও ব্যাপক হারে দখল ও ধ্বংসের শিকার হচ্ছে। দেশের প্রায় ২.৫৭ থেকে ২.৮৭ লাখ একর বনভূমি ৯০ হাজার থেকে ১.৬০ লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার জেলায় সবচেয়ে বেশি বনভূমি বেদখল হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৫৯ হাজার ৪৭১ একর। শুধু বেসরকারি ব্যক্তিরাই নয়, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বনভূমি বরাদ্দ নিয়ে বন ধ্বংস করছে। সম্প্রতি, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও কক্সবাজারের চকরিয়ায় সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে পাকা সড়ক নির্মাণের ফলে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র ও আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ কর্মীরা বলছেন, বনের মাঝে সড়ক নির্মিত হলে মানুষের আনাগোনা বাড়বে এবং বনভূমি দখল, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বনসম্পদ পাচারের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে। এই নির্বিচার বনভূমি দখল ও ধ্বংস বন্যপ্রাণীদের অস্তিত্বকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে, কারণ তারা তাদের প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল হারাচ্ছে।

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এবং ২০২৫ সালের নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বাঘ, হাতিসহ ২৫০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী হত্যা এখন জামিন অযোগ্য অপরাধ। এই আইনে বন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহভাজন বন অপরাধীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুও বন্যপ্রাণী অপরাধ দমনে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পাচার চক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তবে, আইন কঠোর হলেও এর বাস্তবায়ন এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্যে দেখা যায়, উদ্ধারকৃত প্রাণীর তুলনায় গ্রেপ্তার ও সাজার হার অত্যন্ত কম, যা আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবকে নির্দেশ করে। গবেষকরা বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে বিশেষায়িত একটি ইউনিট গঠনের দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া, বন্যপ্রাণী পাচার রোধে আন্তর্জাতিক সংস্থা সাইটিসের (CITES) নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়েছে বাংলাদেশ, যা দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।

সুপারিশ: বাংলাদেশের বন ও বন্যপ্রাণী পাচার এবং বন বিভাগের দুর্নীতি রোধে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এবং এর সাম্প্রতিক অধ্যাদেশের কঠোর ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিকীকরণ করে তাদের জনবল, প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বন বিভাগের অভ্যন্তরে দুর্নীতি ও অনিয়ম নির্মূলে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নিয়মিত ও নিবিড় তদারকি চালিয়ে যেতে হবে এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী পার পেয়ে না যায়। তৃতীয়ত, বনভূমি দখলমুক্ত করতে একটি জাতীয় ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নিতে হবে এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বনভূমি দখলের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার চক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করতে প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত অভিযান জোরদার করতে হবে। পঞ্চমত, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও আইনের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। সবশেষে, বন্যপ্রাণী অপরাধের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে অপরাধীরা বারবার আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে।


🔎 অনুসন্ধানে: শারমিন সুলতানা

শারমিন সুলতানা, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: বন ও বন্যপ্রাণী পাচার।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator