কান থেকে কমার্শিয়াল: আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সিনেমার বিক্রয় কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কান থেকে কমার্শিয়াল: আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সিনেমার বিক্রয় কৌশল

ফারদিন খান  avatar   
ফারদিন খান
কান থেকে কমার্শিয়াল: আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সিনেমার বিক্রয় কৌশল
কান থেকে কমার্শিয়াল: আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সিনেমার বিক্রয় কৌশল
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ফরাসি রিভিয়েরায় অনুষ্ঠিত ৭৬তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশী চলচ্চিত্র 'আগন্তুক'-এর প্রদর্শনী এবং এর আন্তর্জাতিক পরিবেশক কর্তৃক ইউরোপীয় বাজারে আগ...

সম্প্রতি, ফরাসি রিভিয়েরায় অনুষ্ঠিত ৭৬তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশী চলচ্চিত্র 'আগন্তুক'-এর প্রদর্শনী এবং এর আন্তর্জাতিক পরিবেশক কর্তৃক ইউরোপীয় বাজারে আগ্রহ প্রকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। এটি কেবল একটি সিনেমার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনার একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। গত কয়েক বছরে, হাতেগোনা কিছু বাংলাদেশী চলচ্চিত্র বার্লিন, ভেনিস বা বুসানের মতো মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে জায়গা করে নিলেও, সেগুলোকে বাণিজ্যিক সফলতায় রূপান্তরিত করার কৌশলগত ঘাটতি প্রকট। দেশের চলচ্চিত্র শিল্প এখনো আন্তর্জাতিক বাজারের বিশাল সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগাতে পারেনি, যেখানে বৈশ্বিক চলচ্চিত্র বাজার ২২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি রিপোর্ট, ২০২২)। এই প্রেক্ষাপটে, 'কান থেকে কমার্শিয়াল: আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সিনেমার বিক্রয় কৌশল' শিরোনামে একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যেখানে আমাদের লক্ষ্য হবে শুধুমাত্র উৎসবের আলো ঝলমলে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ করার পথ উন্মোচন করা।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদচারণার ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়: প্রথমত, বিশ্বমানের উৎপাদন এবং দ্বিতীয়ত, কার্যকর বিপণন ও বিতরণ ব্যবস্থার অভাব। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা তাদের নিজস্ব প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক উৎসবে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন, কিন্তু তাদের বাণিজ্যিক সাফল্য প্রায়শই স্থানীয় বাজারের বাইরে সীমিত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ‘হাওয়া’ বা ‘পরাণ’-এর মতো চলচ্চিত্রগুলো দেশে অভূতপূর্ব সাফল্য পেলেও, আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের সুসংগঠিত বিক্রয় কৌশল বা বিতরণ নেটওয়ার্কের অভাবে ব্যাপক বাণিজ্যিক প্রসার ঘটেনি। আন্তর্জাতিক বাজার মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত: একটি হলো উৎসবকেন্দ্রিক অ-বাণিজ্যিক বা সীমিত বাণিজ্যিক বিতরণ, যা মূলত সমালোচকদের প্রশংসা এবং পুরস্কারের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে; অন্যটি হলো মূলধারার বাণিজ্যিক বিতরণ, যা বক্স অফিস সাফল্য এবং বৃহত্তর দর্শক আকর্ষণের উপর জোর দেয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রগুলো প্রায়শই প্রথম ধারায় কিছুটা সফল হলেও, দ্বিতীয় ধারায় প্রবেশে ব্যর্থ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশকদের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক স্থাপন, সহ-প্রযোজনা চুক্তির অভাব এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার (যেমন কান মার্চে দু ফিল্ম, ইউরোপিয়ান ফিল্ম মার্কেট) সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অংশগ্রহণের ঘাটতি এই বাণিজ্যিক ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত সীমিত অনুদান মূলত চলচ্চিত্র নির্মাণে সহায়তা করলেও, আন্তর্জাতিক বিপণন ও পরিবেশনার জন্য সুনির্দিষ্ট অর্থায়ন বা কৌশলগত সমর্থন প্রায় অনুপস্থিত।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে বাংলাদেশকে একটি বহুমাত্রিক বিক্রয় কৌশল গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনা চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র ফান্ডের সাথে যৌথভাবে কাজ করার মাধ্যমে কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, বরং প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আন্তর্জাতিক পরিবেশকদের নেটওয়ার্ক এবং অভিজ্ঞ বিপণনকারীদের সাথে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশগুলোর সাথে সহ-প্রযোজনা চুক্তির মাধ্যমে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো প্রায়শই তাদের নিজস্ব বাজারে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সহজে প্রবেশাধিকার পায়। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল বিতরণ প্ল্যাটফর্মগুলোকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা। নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, বা এমএক্স প্লেয়ারের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উচিত এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সরাসরি চুক্তি করার কৌশল অবলম্বন করা, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি করবে। এর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত ইংরেজি সাবটাইটেলিং, আন্তর্জাতিক মানের পোস্ট-প্রোডাকশন এবং চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু যা বৈশ্বিক দর্শকদের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। বাংলাদেশ সরকার এবং ADB-এর সহায়তায় ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের ফলে এই ধরনের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে, তবে এর জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি ও কৌশল প্রণয়ন অপরিহার্য। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোকে কেবল প্রদর্শনী ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে, সেগুলোকে একটি শক্তিশালী বিক্রয় ও নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা। কান মার্চে দু ফিল্ম, বার্লিনাল ইএফএম বা আমেরিকান ফিল্ম মার্কেটের মতো ইভেন্টগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, যেখানে চলচ্চিত্র নির্মাতারা, প্রযোজকরা এবং পরিবেশকরা একত্রিত হন। এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাংলাদেশের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'কান্ট্রি প্যাভিলিয়ন' স্থাপন করা যেতে পারে, যা দেশের চলচ্চিত্রকে সম্মিলিতভাবে উপস্থাপন করবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

বছর আন্তর্জাতিক উৎসবে নির্বাচিত/প্রদর্শিত বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের সংখ্যা (আনুমানিক) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক আন্তর্জাতিক বাজার অংশগ্রহণে অনুদান প্রাপ্ত চলচ্চিত্রের সংখ্যা (আনুমানিক) আন্তর্জাতিক বাজারের সম্ভাব্য রাজস্ব (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)
২০২০ ৭ ১ ০.৮
২০২১ ১০ ২ ১.২
২০২২ ১২ ৩ ১.৫
২০২৩ ১৫ ৪ ২.০

উৎস: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন (প্রাক্কলিত), World Bank Creative Economy Report-এর ভিত্তিতে।

সুপারিশ

  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়) অবিলম্বে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি)-এর অধীনে একটি 'আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রচার ও বিক্রয় ডেস্ক' প্রতিষ্ঠা করবে। এই ডেস্কের প্রধান কাজ হবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার (যেমন কান মার্চে দু ফিল্ম, ইউরোপিয়ান ফিল্ম মার্কেট, আমেরিকান ফিল্ম মার্কেট)-এ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বিক্রয় এজেন্ট ও পরিবেশকদের সাথে বাংলাদেশী নির্মাতাদের সংযোগ স্থাপন করা এবং একটি সুনির্দিষ্ট 'চলচ্চিত্র রপ্তানি অনুদান তহবিল' পরিচালনা করা, যার জন্য প্রতি অর্থবছরে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনা নীতিমালার একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা ও আধুনিকীকরণ করবে। এই নীতিমালায় আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজকদের জন্য আকর্ষণীয় কর সুবিধা (যেমন – ১০% পর্যন্ত কর ছাড়) এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একই সাথে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ভারত, ফ্রান্স, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো চলচ্চিত্র শিল্পে শক্তিশালী দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক চলচ্চিত্র সহ-প্রযোজনা চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করবে।
  • World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় 'বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ডিজিটাইজেশন ও আর্কাইভ প্রকল্প' হাতে নেওয়া হবে, যার মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী চলচ্চিত্রগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ সরকার অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ তত্ত্বাবধানে একটি 'ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট ফান্ড' গঠন করবে, যার প্রাথমিক মূলধন ৫০০ কোটি টাকা হবে এবং যা থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিপণন, উৎসব অংশগ্রহণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য সুনির্দিষ্ট আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারদিন খান

ফারদিন খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সিনেমা ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator