খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনিয়ম | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনিয়ম

ফারজানা আহমেদ  avatar   
ফারজানা আহমেদ
খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনিয়ম
খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনিয়ম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখে, যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো খাদ্যপণ্যে ভেজাল এবং মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন। 'আই...

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখে, যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো খাদ্যপণ্যে ভেজাল এবং মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন। 'আই নিউজ বিডি'-র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর অভ্যন্তরে জেঁকে বসা অনিয়ম ও দুর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে সহজলভ্য প্রায় সব খাদ্যেই কোনো না কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হয়, যা ধীরে ধীরে শরীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং ক্যান্সার, কিডনি বিকল হওয়া, লিভার সমস্যা, হরমোনজনিত অসুস্থতা ও নানা জটিল রোগের কারণ হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিনিয়ত ভেজাল খাবার খেয়ে দেশের প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। শাক-সবজি ও ফলমূলে কপার সালফেট, কার্বাইড ও ফরমালিন; চাল, আটা ও ময়দায় ইউরিয়া সার ও ব্লিচিং পাউডার; মাছ-মাংস ও ডিমে ফরমালিন, অ্যান্টিবায়োটিক ও হরমোনের মতো ক্ষতিকর উপাদান মেশানো হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এমনকি শিশুখাদ্যও ভেজালমুক্ত নয়, যেখানে টেক্সটাইলের রং ব্যবহার করে নকল শিশুখাদ্য তৈরির মতো ঘটনাও সামনে এসেছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ঢাকাসহ সারা দেশে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির অভিযোগে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জরিমানা আদায় এবং কারাদণ্ড প্রদান করেছে। সম্প্রতি, চট্টগ্রামেও ভেজাল-পচা-বাসি খাবার বিক্রির দায়ে হাইওয়ে সুইটস, কেএফসিসহ ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সৈয়দপুরেও ভেজাল বিরোধী অভিযানে দুটি প্রতিষ্ঠানকে লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন এবং নাগরিক সচেতনতার উপর জোর দিয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনও ভেজাল নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এসব অভিযান কিছুটা স্বস্তি দিলেও, ভেজালের মূল উৎপাটনে কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিজস্ব সমস্যা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও সনদ প্রদানের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) নিজেই গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বেড়াজালে আবদ্ধ। চ্যানেল 24-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএসটিআই-এর ৩০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যা শিল্প মন্ত্রণালয় ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত ছিল। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাত্র এক কর্মদিবসেই সকল অডিট আপত্তির জবাব পর্যালোচনা, যাচাই ও সুপারিশ প্রস্তুত করা হয়েছিল, যা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিদিনের বাংলাদেশের এক প্রতিবেদনেও বিএসটিআইতে প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, যেখানে যারা অনিয়মের বিরোধিতা করেছেন, তাদের বদলি হতে হয়েছে। এমনকি বিএসটিআই কর্মকর্তাদের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রামের বিএসটিআই কার্যালয়কে অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়া হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স ও স্যাম্পল পাসের জন্য মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। সরকারি ফি ছাড়াও লাখ টাকা ঘুষ দিয়েও স্যাম্পল পাস না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা অনেক ব্যবসায়ীকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। এই ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম বিএসটিআই-এর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিএসটিআই এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) উভয়ই খাদ্যপণ্যের মান নির্ধারণের দায়িত্ব দাবি করছে, যা এক ধরনের ক্ষমতার লড়াই এবং দ্বৈততার সৃষ্টি করছে। বিএসটিআই প্রায় ৪৬ বছর ধরে খাদ্যের মান প্রণয়ন করে এলেও, বিএফএসএ আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী খাদ্যপণ্য রপ্তানির জন্য ফুড সেফটি অথোরিটির সনদের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে সব সেবা এক ছাতার নিচে আনতে চাইছে। এই ধরনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার দুর্বলতা বাড়িয়ে তুলছে। এছাড়া, ২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইন থাকা সত্ত্বেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পরিদর্শকের অভাব, আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা এবং ভেজালকারীদের লঘু সাজার কারণে তাদের দৌরাত্ম্য থামছে না। অভিযানগুলো বেশিরভাগ সময় রাজধানী কেন্দ্রিক থাকে, ঢাকার বাইরে এর তৎপরতা সীমিত। ভোক্তাদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের সচেতনতার অভাবও এই সমস্যাকে আরও প্রকট করছে।

খাদ্যে ভেজাল ও মানহীন পণ্যের অবাধ বিস্তার দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মানুষের মধ্যে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগের প্রকোপ বাড়ছে, যা চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি করছে এবং কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ অপরিহার্য। শুধু আইন প্রণয়ন বা মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, যা কোনো প্রকার দুর্নীতি বা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবে।

সুপারিশ: খাদ্য ভেজাল রোধ এবং বিএসটিআই-এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য নিম্নোক্ত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি: প্রথমত, বিএসটিআই-এর অভ্যন্তরে উত্থাপিত সকল দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি প্রদান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিএসটিআই এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতার সুস্পষ্ট বিভাজন এবং কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দ্বৈততা ও ক্ষমতার লড়াই পরিহার করা যায়। তৃতীয়ত, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এবং ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫ এর কঠোর ও নিয়মিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে ঢাকার বাইরের অঞ্চলগুলোতেও অভিযান জোরদার করতে হবে। চতুর্থত, খাদ্য পরীক্ষাগারগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিকীকরণ করতে হবে, যাতে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে খাদ্যপণ্যের মান পরীক্ষা করা যায়। পঞ্চমত, খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নিয়মিত ও নিবিড় তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ষষ্ঠত, ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ ও নিরাপদ করতে হবে। সবশেষে, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি কারাদণ্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা এমন অপরাধে পুনরায় জড়াতে সাহস না পায়।


🔎 অনুসন্ধানে: ফারজানা আহমেদ

ফারজানা আহমেদ, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই (BSTI) ওয়াচ।

Walang nakitang komento


News Card Generator