গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং: বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের সবুজায়নের পথে কাঁটা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং: বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের সবুজায়নের পথে কাঁটা

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং: বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের সবুজায়নের পথে কাঁটা
গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং: বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের সবুজায়নের পথে কাঁটা
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে পরিবেশগত মানোন্নয়ন এবং শ্রমিক সুরক্ষায় ধীর গতিতে অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।...

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে পরিবেশগত মানোন্নয়ন এবং শ্রমিক সুরক্ষায় ধীর গতিতে অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে, ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবং হংকং কনভেনশন বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পূরণে এই খাতের বর্তমান পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও সীতাকুণ্ড উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় দেড় শতাধিক জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের চেষ্টা করছে, যা সামগ্রিক সবুজায়নের পথে এক বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাহাজ ভাঙা শিল্প একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে এবং লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক গুরুত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে পরিবেশ দূষণ এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির এক ভয়াবহ চিত্র। দীর্ঘকাল ধরে, এই শিল্পে জাহাজ ভাঙার সনাতনী পদ্ধতি পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পুরনো জাহাজে ব্যবহৃত বিষাক্ত পদার্থ যেমন অ্যাসবেস্টস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইলস (PCBs), ভারী ধাতু এবং তেল সমুদ্রে ও মাটিতে মিশে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষণ না থাকায় প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে, যা অকাল মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের কারণ হয়। যদিও বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালে 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন' প্রণয়ন করেছে এবং হংকং কনভেনশন অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, তবুও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সমন্বয়ের অভাব প্রকট। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন শিল্প মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়হীনতা সবুজায়নের প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে দিয়েছে। ইয়ার্ড মালিকদের মধ্যে স্বল্পমেয়াদী লাভের প্রবণতা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের অনীহা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।

এই শিল্পের সবুজায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং আর্থিক সক্ষমতার অভাব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড স্থাপন করতে হলে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা অধিকাংশ স্থানীয় ইয়ার্ড মালিকের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না। উন্নত স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, অ্যাসবেস্টস ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি এবং আধুনিক ক্রেন ও লিফটিং সরঞ্জাম স্থাপনে যে কারিগরি জ্ঞান ও অর্থ প্রয়োজন, তার জোগান অপ্রতুল। উপরন্তু, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ADB) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো থেকে ঋণ সহায়তা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শর্তাবলী পূরণ করাও অনেক ইয়ার্ডের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও বাংলাদেশ সরকার সবুজ শিল্পের প্রসারে বিভিন্ন নীতি সহায়তা প্রদানের কথা বলছে, কিন্তু তা প্রান্তিক ইয়ার্ড মালিকদের কাছে পৌঁছাতে প্রায়শই ব্যর্থ হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় তারা নিয়মিত তদারকি এবং আইন প্রয়োগে হিমশিম খাচ্ছে। ফলস্বরূপ, অনেক ইয়ার্ড এখনও পুরনো এবং ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যা একদিকে যেমন পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তেমনি অন্যদিকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করছে। বিশ্বব্যাপী যখন টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতের পিছিয়ে পড়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগের কারণ।

সূচক ২০১৯ ২০২১ ২০২৩ (প্রক্ষেপিত)
হংকং কনভেনশন অনুবর্তী ইয়ার্ডের সংখ্যা ৫টি ১০টি ১৫টি
মোট ইস্পাত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ (লক্ষ টন) ৫০ ৬২ ৭০
পরিবেশগত মানোন্নয়নে গড় বিনিয়োগ (প্রতি ইয়ার্ড, মিলিয়ন ডলার) ০.৫ ১.২ ১.৮
শ্রমিক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের হার (%) ৩০% ৪৫% ৬০%

উৎস: বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (BSBRA) এবং পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সরকার (আংশিক বিশ্বব্যাংক সমীক্ষা ভিত্তিক)।

সুপারিশ

  • শিল্প মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮' এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এর অংশ হিসেবে, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE)-এর জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি করে নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগ কঠোর করতে হবে। বিশেষ করে, হংকং কনভেনশনের শর্তাবলী মেনে চলার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ইয়ার্ডগুলোকে বাধ্য করা উচিত।
  • বাংলাদেশ সরকার, বিশ্বব্যাংক এবং ADB-এর সহায়তায় একটি 'সবুজ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ তহবিল' গঠন করতে হবে। এই তহবিল থেকে ইয়ার্ড মালিকদেরকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে (যেমন - আধুনিক স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, অ্যাসবেস্টস নিষ্কাশন সুবিধা) সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এই তহবিলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে এবং ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
  • আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা (IMO) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)-এর সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। এর মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, শ্রমিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন এবং পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে। একই সাথে, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (BSBRA)-কে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ইয়ার্ড মালিকদের উৎসাহিত করতে এবং বৈশ্বিক শিপিং কোম্পানিগুলোর সাথে সবুজ রিসাইক্লিং চুক্তি সম্পাদনে মধ্যস্থতা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator