আইপিও বাজারে দুর্বল কোম্পানির দাপট: মৌলভিত্তির আড়ালে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আইপিও বাজারে দুর্বল কোম্পানির দাপট: মৌলভিত্তির আড়ালে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
আইপিও বাজারে দুর্বল কোম্পানির দাপট: মৌলভিত্তির আড়ালে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি
আইপিও বাজারে দুর্বল কোম্পানির দাপট: মৌলভিত্তির আড়ালে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)-এর প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (IPO) বাজারে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির আধিপত্য বিনিয়োগক...

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)-এর প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (IPO) বাজারে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির আধিপত্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত দুই অর্থ বছরে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক অনুমোদিত বেশ কয়েকটি নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির তালিকা-পরবর্তী পারফরম্যান্স (Post-listing performance) এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে তালিকাভুক্ত হওয়া প্রায় ৩০% কোম্পানির শেয়ার মূল্য তাদের ইস্যু মূল্যের নিচে নেমে এসেছে, যা দুর্বল মৌলভিত্তি এবং অতিমূল্যায়িত আইপিও মূল্যের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। এই প্রবণতা বাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষয় করছে এবং দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি বাজারের স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশনের (BSEC) কঠোর নজরদারি এবং মূল্যায়নের ঘাটতি এই পরিস্থিতিতে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে, যেখানে কোম্পানিগুলো প্রায়শই আকর্ষণীয় আর্থিক প্রতিবেদন প্রদর্শন করে কিন্তু তালিকাভুক্তির পর তাদের প্রকৃত দুর্বলতা প্রকাশ পায়।

আইপিও প্রক্রিয়ায় দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর উত্থানের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ক্রিয়াশীল। এর মধ্যে অন্যতম হলো 'বুক-বিল্ডিং' প্রক্রিয়ার অপব্যবহার। এই পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (যেমন মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি) মাধ্যমে একটি কোম্পানির শেয়ারের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের কথা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট বা যোগসাজশের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে উচ্চ দর প্রস্তাব করা হয়। ফলে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য যে কাট-অফ প্রাইস নির্ধারিত হয়, তা প্রায়শই কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি হয়। একইসাথে, কিছু ইস্যু ম্যানেজার এবং মার্চেন্ট ব্যাংক তাদের ফি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দুর্বল কোম্পানির আইপিওতে সমর্থন জুগিয়ে থাকে, যা নৈতিকতার মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক প্রণীত আইপিও বিধিমালায় কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য, ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য কঠোর মানদণ্ড থাকলেও, প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখা যায়। অনেক কোম্পানি তাদের আবেদনকালে দেখানো মুনাফা, সম্পদ এবং দায়বদ্ধতার হিসাবকে তালিকাভুক্তির পর বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) এর মাধ্যমে শেয়ার লেনদেন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া যতই স্বচ্ছ হোক না কেন, যদি প্রাথমিক মূল্যায়নেই ত্রুটি থাকে, তবে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি সুরক্ষায় তা যথেষ্ট নয়।

এই দুর্বল কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি কেবল একক বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করে না, বরং সামগ্রিক বাজার কাঠামো এবং তারল্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। যখন একটি দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি উচ্চ মূল্যে তালিকাভুক্ত হয় এবং পরবর্তীতে তার শেয়ারের দাম কমে যায়, তখন অনেক বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজি হারায়। এর ফলে নতুন আইপিওতে বিনিয়োগ করার আগ্রহ কমে যায় এবং সেকেন্ডারি বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পরিবর্তে ফটকাবাজির প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যা একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া, এই ধরনের কোম্পানিগুলোর দুর্বল কর্পোরেট সুশাসন, স্বচ্ছতার অভাব এবং সময়মতো সঠিক তথ্য প্রকাশ না করার প্রবণতা বাজারের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)-এর মতো স্টক এক্সচেঞ্জগুলো তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উপর নিয়মিত নজরদারি করলেও, প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর অনুমোদনের সময় যদি দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত না হয়, তবে তালিকাভুক্তির পরবর্তী নজরদারি কেবল ক্ষতি প্রশমনেই সীমাবদ্ধ থাকে, তা প্রতিরোধে কার্যকর হয় না। এর ফলে, প্রকৃত শক্তিশালী কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হয় এবং পুঁজি সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম তার কার্যকারিতা হারায়।

অর্থবছর মোট অনুমোদিত IPO সংখ্যা দুর্বল মৌলভিত্তির IPO (% মোট) ইস্যু মূল্যের নিচে নেমে আসা (% তালিকাভুক্তির ১ বছর পর) প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অতি-সাবস্ক্রিপশন হার (গড়)
২০২০-২১ ২২ ৩০% ২০% ১৫ গুণ
২০২১-২২ ১৮ ৩৫% ২৫% ১২ গুণ
২০২২-২৩ ১৩ ৪০% ৩০% ১০ গুণ
২০২৩-২৪ (প্রথমার্ধ) ৭ ৪২% ৩৫% ৮ গুণ

উৎস: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) প্রকাশিত ডেটা অ্যানালাইসিস।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (IPO) জন্য কোম্পানি মূল্যায়নের বিদ্যমান 'বুক-বিল্ডিং' ও 'ফিক্সড-প্রাইস' পদ্ধতি পর্যালোচনা করে কমপক্ষে তিন বছরের লাভজনকতা, ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহের পূর্বাভাস এবং ঋণ-ইক্যুইটি অনুপাতকে বাধ্যতামূলক করার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। বিশেষ করে, 'বুক-বিল্ডিং' প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিডিং (bidding) প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে বিডিংয়ের সময় এবং প্রক্রিয়ার উপর কঠোর নজরদারি এবং কারসাজি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ আইন, ১৯৯৩ (ধারা ১৭) অনুযায়ী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।
  • ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) কর্তৃক তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর তালিকা-পরবর্তী (Post-listing) আর্থিক পারফরম্যান্স এবং কর্পোরেট সুশাসন পরিবীক্ষণে একটি স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা উচিত। এই কমিটি নিয়মিতভাবে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত এবং তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতা যাচাই করবে। যদি কোনো কোম্পানি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয় বা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে, তবে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক এক্সচেঞ্জ তালিকাভুক্তি) বিধিমালা, ২০১৫ এর আওতায় দ্রুত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি এবং প্রয়োজনে তালিকাচ্যুতির প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
  • সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর সমন্বয়ে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি শক্তিশালী অনলাইন অভিযোগ নিষ্পত্তি পোর্টাল তৈরি করা উচিত, যেখানে বিনিয়োগকারীরা আইপিও সংক্রান্ত অনিয়ম, মিথ্যা তথ্য প্রদান বা তালিকাভুক্ত কোম্পানির দুর্বল পারফরম্যান্স সম্পর্কে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবে। এই পোর্টালের মাধ্যমে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য BSEC এর এনফোর্সমেন্ট বিভাগকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রদান এবং এর অগ্রগতি জনসম্মুখে প্রকাশ করার একটি প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator