বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়..

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম  avatar   
প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম
বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়..
বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়..
ছবি: সংগৃহীত

গত এক দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও, ২০২২ সালের শুরু থেকে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট এবং এর ফলস্বরূপ ব্যাপক লোডশেডিং দেশ.....

গত এক দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও, ২০২২ সালের শুরু থেকে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট এবং এর ফলস্বরূপ ব্যাপক লোডশেডিং দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে, ২০২২ সালের জুলাই মাসে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ মূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তের পর, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়ে দৈনিক প্রায় ১৫০০-২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেয়, যা শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জনজীবন পর্যন্ত মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। এই সংকট কেবল জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ফল নয়, বরং দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ত্রুটিগুলোকেও প্রকটভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত বর্তমানে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৭৫-৮০% প্রাকৃতিক গ্যাস, ফার্নেস তেল এবং কয়লার মাধ্যমে উৎপাদিত হয়, যার একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিশেষ করে, দেশের গ্যাস রিজার্ভ কমে আসায় এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে ধীর গতির কারণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং পেট্রোবাংলা উভয়ই আর্থিক সংকটে পড়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ফলস্বরূপ, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি বেড়েছে বহুগুণ, যা জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। World Bank তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি অব্যাহত থাকলে তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি, বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ বা সক্ষমতা চার্জের বোঝা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করেছে, যেখানে অনেক কেন্দ্র উৎপাদন না করেও মোটা অঙ্কের অর্থ পাচ্ছে।

জ্বালানি সংকটের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দীর্ঘদিনের অবহেলা। পেট্রোবাংলা কর্তৃক নতুন কূপ খনন এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ব্যাপক হওয়া সত্ত্বেও এর অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। স্রেডা (সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি) কর্তৃক প্রণীত নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি থাকলেও, সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ, গ্রিড সংযোগের সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এই খাতের সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) একাধিকবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহ দেখালেও, প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জটিলতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে গতি পাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণেও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের অভাব রয়েছে, যার ফলে উৎপাদিত বিদ্যুতের অপচয় এবং গ্রিড অস্থিতিশীলতা একটি নিয়মিত সমস্যা। আধুনিক স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি এবং উন্নত বিতরণ ব্যবস্থার অভাবে বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অপচয় কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সূচক ২০১৯ সাল ২০২১ সাল ২০২৩ সাল (প্রাক্কলিত)
মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (মেগাওয়াট) ২০,৮০০ ২৫,০০০ ২৬,৫০০
সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন (মেগাওয়াট) ১২,৮০০ ১৪,০০০ ১৬,০০০
জ্বালানি মিশ্রণ: প্রাকৃতিক গ্যাস (%) ৬১% ৫০% ৪৫%
জ্বালানি মিশ্রণ: ফার্নেস তেল (%) ২৫% ২৮% ৩০%
জ্বালানি মিশ্রণ: কয়লা (%) ২% ৬% ১১%
জ্বালানি মিশ্রণ: নবায়নযোগ্য (%) ৩% ৪% ৪.৫%
বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক ভর্তুকি (বিলিয়ন টাকা) ৯.০০ ১১.৫০ ৩৪.০০

উৎস: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • পেট্রোবাংলাকে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এই পরিকল্পনার আওতায় আগামী ৫ বছরের মধ্যে অন্তত ১০টি নতুন অনুসন্ধান কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এবং বিশ্বব্যাংকের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় আধুনিক থ্রি-ডি সিসমিক সার্ভে প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে এই কার্যক্রমের নিবিড় তদারকি করতে হবে।
  • বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং স্রেডা (সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি)-কে সাথে নিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ৪০% নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য একটি বিস্তারিত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। এই রোডম্যাপে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে সহজীকরণ করা, বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া এবং এডিবির আর্থিক সহায়তায় জাতীয় গ্রিডকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে আপগ্রেড করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
  • বিদ্যুৎ বিভাগকে জাতীয় গ্রিড আধুনিকীকরণ ও স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি ব্যাপক প্রকল্প হাতে নিতে হবে, যা বিদ্যুতের অপচয় কমাবে এবং বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করবে। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮ এর আওতায় স্মার্ট মিটারিং বাধ্যতামূলক করা, জরাজীর্ণ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন প্রতিস্থাপন করা এবং World Bank-এর সহায়তায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জনবল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator