নব্বইয়ের দশকের অন্যতম অবিস্মরণীয় এবং বিশ্বজুড়ে সমাদৃত গান ‘বেয়ারলি ব্রিদিং’-এর কণ্ঠশিল্পী, খ্যাতনামা গায়ক ও গীতিকার ডানকান শেইক আর নেই। গত সপ্তাহে ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই প্রতিভাবান শিল্পী। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৬ বছর। শিল্পীর মা সুজান শেইক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে তাঁর মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন। প্রাথমিক চিকিৎসাগত প্রতিবেদনে জানা গেছে, হার্ট ফেইলিওর বা হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, মৃত্যুর ঠিক একদিন আগেও তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক হলেও কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। সঙ্গীত জগতে তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণ এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বজুড়ে অগণিত ভক্তের কাছে ডানকান শেইক চিরকাল তাঁর অমর সৃষ্টি ‘বেয়ারলি ব্রিদিং’ গানের মাধ্যমেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ১৯৯৬ সালের গ্রীষ্মকালের প্রতীকী গান হিসেবে পরিচিত এই ট্র্যাকটি তাঁর নিজের নামেই প্রকাশিত প্রথম অ্যালবামে স্থান পেয়েছিল এবং প্রকাশের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছিল। গানটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ ‘বিলবোর্ড হট ১০০’ তালিকায় টানা ৫৫ সপ্তাহ ধরে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছিল এবং তালিকার ১৬তম স্থান পর্যন্ত উন্নীত হয়েছিল। এই একক গানটির বাণিজ্যিক ও শৈল্পিক সফলতা তাঁকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে তোলে এবং সঙ্গীত জীবনের শুরুতেই তাঁকে ‘সেরা পুরুষ পপ ভোকাল পারফরম্যান্স’ বিভাগে অত্যন্ত সম্মানজনক গ্র্যামি পুরস্কারের মনোনয়ন এনে দেয়। পপ সঙ্গীতের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর এই অনন্য প্রতিভা পরবর্তীতে তাঁকে আরও বহুমাত্রিক ও সৃজনশীল কাজের দিকে ধাবিত করে।
পপ সঙ্গীতের সাফল্যের পর ডানকান শেইক নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং তিনি মিউজিক্যাল থিয়েটারের কঠিন ও সৃজনশীল দুনিয়ায় পা রাখেন এবং সেখানেও অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেন। গীতিকার স্টিভেন সাটারের সাথে যৌথভাবে কাজ করে তিনি ব্রডওয়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় মিউজিক্যাল নাটক ‘স্প্রিং অ্যাওয়েকেনিং’-এর সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর জার্মানিতে কিশোর-কিশোরীদের বেড়ে ওঠার জটিল মানসিকতার পটভূমিতে নির্মিত এই প্রযোজনাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এটি ‘সেরা মিউজিক্যাল’সহ মোট আটটি মর্যাদাপূর্ণ টনি অ্যাওয়ার্ড জয় করতে সক্ষম হয় এবং এর চমৎকার ‘কাস্ট অ্যালবাম’-এর সুবাদে শেইক আরও একটি গ্র্যামি পুরস্কার অর্জন করেন। ব্রডওয়ের পাশাপাশি তিনি ‘আমেরিকান সাইকো’, ‘অ্যালিস বাই হার্ট’, ‘হুইস্পার হাউস’ এবং ‘দ্য সিক্রেট লাইফ অফ বিজ’-এর মতো বিখ্যাত মঞ্চ প্রযোজনার সাথে যুক্ত ছিলেন। মঞ্চের কাজের পাশাপাশি তিনি মূলধারার সঙ্গীত চর্চাও অব্যাহত রাখেন এবং ২০২২ সালে তাঁর সর্বশেষ একক স্টুডিও অ্যালবাম ‘ক্ল্যাপট্র্যাপ’ প্রকাশ করেন।
ডানকান শেইকের প্রয়াণে তাঁর পরিবার, সহকর্মী এবং অনুরাগীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত্যুর পর এক আবেগঘন যৌথ বিবৃতিতে তাঁর পরিবার তাঁকে একজন স্নেহশীল বাবা, নিবেদিতপ্রাণ স্বামী, আদরের সন্তান, বিশ্বস্ত ভাই এবং পরম বন্ধু হিসেবে স্মরণ করেছে। তাঁর সংবেদনশীল মননশীলতা, সূক্ষ্ম রসবোধ, প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং শিল্পের প্রতি আজীবন অনুরাগ তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর করে রাখবে। মৃত্যুর সময়ে তিনি তাঁর স্ত্রী নোরা আরিফিন এবং সাত বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে ইনেসকে রেখে গেছেন। পপ সঙ্গীত এবং ব্রডওয়ের মঞ্চে তাঁর বহুমুখী অবদান নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সবসময় অনুপ্রাণিত করবে এবং তাঁর সৃজনশীলতার আলো বিশ্ব সঙ্গীত অঙ্গনে চিরকাল দীপ্তমান থাকবে।