বেইজিংয়ের নীরব খেলা: দক্ষিণ এশিয়ার ঋণের জালে ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ | আই নিউজ বিডি

বেইজিংয়ের নীরব খেলা: দক্ষিণ এশিয়ার ঋণের জালে ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
বেইজিংয়ের নীরব খেলা: দক্ষিণ এশিয়ার ঋণের জালে ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
বেইজিংয়ের নীরব খেলা: দক্ষিণ এশিয়ার ঋণের জালে ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত
সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন ২০২২ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রায় ৫.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রদান করে বিশ্বের বৃহ...

সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন ২০২২ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রায় ৫.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রদান করে বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি ঋণদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দক্ষিণ এশিয়ায় তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) প্রকল্পের মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত। এই ব্যাপক আর্থিক প্রভাব এখন কেবল একটি অর্থনৈতিক ঘটনা নয়, বরং একটি সুস্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা কলম্বো থেকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত দেশগুলোর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং কূটনৈতিক জোটগুলোকে অবকাঠামো উন্নয়নের ছদ্মবেশে সূক্ষ্মভাবে পুনর্গঠন করছে। এই নীরব খেলা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে গভীর ও জটিল উপায়ে প্রভাবিত করছে, যেখানে অর্থনৈতিক নির্ভরতা প্রায়শই কৌশলগত আপস এবং পরিবর্তিত আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকে পরিচালিত করে।

চীনের ঋণ কৌশল, যা প্রায়শই পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় কম কঠোর শর্তে আসে, কিন্তু প্রায়শই প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য চীনা কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করে, যার ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি সুবিধা সীমিত হয়। এই ঋণের চুক্তিগুলো প্রায়শই অস্বচ্ছ হয় এবং উচ্চ সুদের হার বহন করে, যা কৌশলগত সম্পদ যেমন বন্দর, খনি বা জ্বালানি গ্রিডকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক দুর্বলতা তৈরি করে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বা পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকট কীভাবে কৌশলগত ছাড়ে রূপান্তরিত হয়েছে, তা এর প্রধান উদাহরণ, যা কার্যকরভাবে চীনের হাতে সার্বভৌম সম্পদের উপর উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। এই অর্থনৈতিক জড়িয়ে পড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, যেখানে তাদের অর্থনৈতিক টিকে থাকা ক্রমবর্ধমানভাবে বেইজিংয়ের সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ফোরাম এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোতে তাদের পররাষ্ট্রনীতির বিকল্পগুলো সংকুচিত হয়। দ্রুত উন্নয়নের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি প্রায়শই কৌশলগত স্বাধীনতার ক্রমান্বয়ে ক্ষয়কে আড়াল করে, যা ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী রূপ।

এই চীনা আর্থিক প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে, বিশেষ করে ভারতের ঐতিহ্যবাহী প্রভাবকে, কীভাবে প্রভাবিত করছে তা ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক ক্ষমতার গতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করছে, যা কিছু দক্ষিণ এশীয় দেশকে তাদের পররাষ্ট্রনীতি পুনর্গঠনে বাধ্য করছে। বিভিন্ন দক্ষিণ এশীয় দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলো এই জটিল জালিকাটি প্রতিনিয়ত নেভিগেট করছে, ঐতিহ্যবাহী অংশীদারদের বিমুখ না করে বা সম্পূর্ণভাবে চীনা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে অর্থনৈতিক সুবিধা সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, আংশিকভাবে বাহ্যিক প্রভাব দ্বারা উদ্ভূত অভ্যন্তরীণ ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে। বঙ্গোপসাগর বহু-খাত প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ (BIMSTEC), যা প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সামুদ্রিক সংযোগের উপর মনোযোগের কারণে আরও কার্যকর বিকল্প হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল, সেটিও বাহ্যিক আর্থিক চাপের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। চীনের উপর ক্রমবর্ধমান দ্বিপাক্ষিক নির্ভরতা প্রায়শই বহুপাক্ষিক আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোকে দুর্বল করে দেয়, যার ফলে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য সাধারণ চ্যালেঞ্জগুলো সম্মিলিতভাবে মোকাবেলা করা বা বাহ্যিক শক্তিগুলোর সাথে শক্তিশালী অবস্থান থেকে আলোচনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই বিভাজন চীনের কৌশলগত স্বার্থ পূরণ করে, তার ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধ করে।

এই অর্থনৈতিক উপস্থিতির নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রভাব, উভয় ঐতিহ্যবাহী এবং অ-ঐতিহ্যবাহী, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উপস্থিতি প্রায়শই বর্ধিত নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক সহায়তা এবং নৌবাহিনীর বন্দর পরিদর্শনের দিকে পরিচালিত করে, যা ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো অন্যান্য পরাশক্তির মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। "মুক্তার মালা" (String of Pearls) কৌশল, যদিও বেইজিং দ্বারা অস্বীকার করা হয়, ভারত মহাসাগর জুড়ে কৌশলগত বন্দর উন্নয়নে এর প্রতিধ্বনি খুঁজে পাওয়া যায়। এটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নৌচলাচলের স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে? দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ, যারা বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা (UN Peacekeeping) মিশনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে, তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এখন নতুন ধরনের চাপের মুখে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের পররাষ্ট্রনীতির পছন্দ, যার মধ্যে জাতিসংঘের ভোটও অন্তর্ভুক্ত, তাদের অর্থনৈতিক ঋণের দ্বারা সূক্ষ্মভাবে প্রভাবিত হতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব সাবধানে পরিচালনা করা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহে বৈচিত্র্য আনা এবং নিশ্চিত করা যে অর্থনৈতিক চুক্তিগুলো জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ বা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন না করে। বেইজিংয়ের নীরব খেলা কেবল অর্থনীতি নিয়ে নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটির নিরাপত্তা কাঠামোকে ধীরে ধীরে পুনর্গঠন করছে।

দেশ চীনের মোট বিনিয়োগ ও ঋণ (প্রায়, ২০০৫-২০২৩) উল্লেখযোগ্য প্রকল্প মোট জাতীয় ঋণে চীনের অংশ (আনুমানিক)
পাকিস্তান $৬২ বিলিয়ন চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC), গোয়াদর বন্দর ২৫-৩০%
শ্রীলঙ্কা $১৩ বিলিয়ন হাম্বানটোটা বন্দর, কলম্বো পোর্ট সিটি ১০-১৫%
বাংলাদেশ $৪ বিলিয়ন পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর ৭-১০%
নেপাল $১ বিলিয়ন ট্রান্স-হিমালয়ান মাল্টিডাইমেনশনাল কানেক্টিভিটি নেটওয়ার্ক ৫-৮%

উৎস: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), বিশ্বব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন সংকলিত।

সুপারিশ

  • দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে ঋণ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এর ঋণ স্বচ্ছতা নির্দেশিকা (Debt Transparency Guidelines) কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য একটি আঞ্চলিক চুক্তি বা সার্ক/BIMSTEC কাঠামোতে একটি অভিন্ন নীতি প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ঋণের শর্তাবলী এবং প্রকল্প ব্যয় সম্পূর্ণরূপে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়।
  • দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এবং বঙ্গোপসাগর বহু-খাত প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ (BIMSTEC) এর মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক অবকাঠামো তহবিল (Regional Infrastructure Fund) গঠন করে বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরি করা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা, যাতে একক বাহ্যিক শক্তির উপর নির্ভরতা কমে।
  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোর উচিত একটি সুষম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যেখানে শুধু চীনের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অন্যান্য প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করা এবং UN Peacekeeping মিশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের গুরুত্ব ও দর কষাকষির ক্ষমতা তুলে ধরা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator