অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

সাবরিনা চৌধুরী  avatar   
সাবরিনা চৌধুরী
অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ইউজিসি (University Grants Commission) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গমনের হার প্র...

সম্প্রতি ইউজিসি (University Grants Commission) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গমনের হার প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের মেধা ও সম্পদের এক নীরব বহির্গমন নির্দেশ করে। বিশেষ করে, জার্মানির DAAD, কানাডার Vanier Canada Graduate Scholarships বা অস্ট্রেলিয়ার RTP স্কলারশিপের মতো মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক বৃত্তিগুলোর জন্য আবেদনের সংখ্যা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, কিন্তু এর বিপরীতে সফলতার হার তুলনামূলকভাবে কম। এই প্রবণতা শুধু একটি সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, বরং দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থার সংকট এবং আন্তর্জাতিক মানের সুযোগের তীব্র আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। অথচ, এই বিপুল সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থীর আন্তর্জাতিক মঞ্চে পদার্পণের ক্ষেত্রে সমন্বিত রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব প্রায়শই পরিলক্ষিত হয়, যা তাদের সম্ভাবনাময় পথচলাকে আরও জটিল করে তোলে।

এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতার মূলে রয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগের অভাব। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা অবকাঠামো, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা সহায়তা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ইউজিসি যদিও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করছে এবং মান নিশ্চিতকরণ ইউনিট (Quality Assurance Unit) সক্রিয় রেখেছে, তবে এর কার্যকারিতা এবং নীতিমালা বাস্তবায়নে এখনো অনেক ঘাটতি বিদ্যমান। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়শই অত্যাধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি, আন্তঃবিষয়ক গবেষণা এবং শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো সীমিত। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন এবং বিশ্বব্যাপী কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের পরিবার এবং দেশের জন্য একটি বড় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। উন্নত ক্যারিয়ার সম্ভাবনা, উচ্চতর বেতন এবং উন্নত জীবনযাত্রার আকাঙ্ক্ষা এই অভিবাসনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

বৈশ্বিক বৃত্তি অর্জনের পথে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য তথ্যগত অসামঞ্জস্যতা এবং উপযুক্ত প্রস্তুতির অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের আবেদনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং প্রতিযোগিতামূলক, যার জন্য শুধু ভালো একাডেমিক ফলই যথেষ্ট নয়, বরং শক্তিশালী গবেষণা প্রস্তাবনা, ব্যক্তিগত প্রবন্ধ, ভাষার দক্ষতা (যেমন IELTS, TOEFL) এবং রেফারেন্স লেটারও অত্যাবশ্যক। দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের এই ধরনের প্রস্তুতিতে কার্যকর দিকনির্দেশনা এবং সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা অপ্রতুল। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যদিও দেশের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে, তবে তাদের কর্মসূচিগুলো প্রায়শই আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়শই ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি বা সবুজ প্রযুক্তির মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে উচ্চতর দক্ষতার প্রত্যাশা করে, যা আমাদের প্রচলিত কারিকুলামে এখনো সেভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এর ফলে, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে হিমশিম খাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এই মেধা অভিবাসনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একদিকে, যারা সফলভাবে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশে ফিরে আসেন, তারা নতুন জ্ঞান, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন, যা 'ব্রেইন গেইন' হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে, একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে, যা দেশের জন্য 'ব্রেইন ড্রেন' বা মেধা পাচার হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে দেশ তার সবচেয়ে প্রতিভাবান এবং প্রশিক্ষিত জনশক্তি হারায়, যা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করতে পারলেও, এখন পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয়। বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের একটি সুসংগঠিত ডেটাবেস এবং তাদের পেশাগত অগ্রগতি ট্র্যাক করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি, যা ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই ডেটার অভাবে, সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মেধা পাচারের প্রকৃত চিত্র এবং এর প্রভাব সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পেতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা কার্যকর সমাধান প্রণয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।

সূচক ২০১৮ ২০২০ ২০২২ ২০২৩ (আনুমানিক)
বিদেশগামী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী (লক্ষ) ০.৬ ০.৮ ১.১ ১.৩
উচ্চশিক্ষায় গবেষণা বরাদ্দ (ইউজিসি, মোট বাজেটের %) ১.২% ১.৩% ১.৫% ১.৪%
এনএসডিএ'র অধীনে দক্ষতা প্রশিক্ষণার্থী (হাজার) ১১০ ১২৫ ১৫০ ১৬৫
কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৫০ ৯৮০ ১০০০ ১০০০+

উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, বিএএনবিইআইএস এবং এনএসডিএ প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বার্ষিক পরিসংখ্যান।

সুপারিশ

  • ইউজিসি'কে (University Grants Commission) উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ল্যাব ও প্রকাশনা সহায়তা বৃদ্ধিতে একটি সুনির্দিষ্ট বার্ষিক 'গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল' গঠন করতে হবে। এই তহবিলের সুষ্ঠু বণ্টনের জন্য 'গবেষণা নীতিমালা ২০২৪' (উদাহরণস্বরূপ) প্রণয়ন ও কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার জন্য প্রণোদনা এবং গবেষণা অনুদানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী 'বৈশ্বিক কর্মসংস্থান দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি' চালু করতে হবে। এই কর্মসূচিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্সের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি ম্যান্ডারিন, জার্মান, ফরাসি'র মতো বিদেশী ভাষা শিক্ষায় জোর দিতে হবে। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য 'বৈশ্বিক বৃত্তি তথ্য ও পরামর্শ কেন্দ্র' প্রতিষ্ঠা করে আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের তথ্য সহজলভ্য করতে হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে (Ministry of Education) 'জাতীয় উচ্চশিক্ষা ও বৈশ্বিক বৃত্তি কৌশলপত্র ২০২৫' (উদাহরণস্বরূপ) প্রণয়ন করতে হবে, যা দেশীয় উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বৃত্তি প্রাপ্তির হার বৃদ্ধি এবং 'ব্রেইন ড্রেন' রোধে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর মাধ্যমে বিদেশগামী শিক্ষার্থী এবং বৃত্তিপ্রাপ্তদের একটি বিস্তারিত ডেটাবেস তৈরি ও নিয়মিত হালনাগাদ করার জন্য 'জাতীয় শিক্ষা তথ্য আইন ২০২৪' (উদাহরণস্বরূপ) সংশোধন করে ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাবরিনা চৌধুরী

সাবরিনা চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator